দীর্ঘ কর্মজীবনে চরম পদোন্নতি বঞ্চনার শিকার হলেও সততা ও মেধার জোরে অবশেষে নিজ আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন কক্সবাজারের সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আমিনুল ইসলাম। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে যুগ্মসচিব হিসেবে অবসরে যেতে বাধ্য হওয়া এই দক্ষ প্রশাসক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সুবিচার পেয়ে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিতে সচিব হন। আর এবার তিনি পেলেন দেশের অন্যতম বৃহৎ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ দায়িত্ব। কক্সবাজারের পরিচিত এই মুখকে ঢাকা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
গতকাল মঙ্গলবার (১০ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক এই নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী মো. আমিনুল ইসলামকে অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে এক বছর মেয়াদে ঢাকা ওয়াসার এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। ওয়াসায় সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এ নিয়োগকে অনেকেই সময়োচিত হিসেবে দেখছেন।
এর আগে রোববার (৮ মার্চ) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম ব্যাপারী পদত্যাগ করেন। এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহা. মনিরুজ্জামানকে সাময়িকভাবে ভারপ্রাপ্ত এমডি করা হলেও মো. আমিনুল ইসলামের নিয়োগের মধ্য দিয়ে ঢাকা ওয়াসা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পূর্ণকালীন ও ‘ক্লিন ইমেজের’ একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পেল বলে অনেকে মনে করছেন।
কক্সবাজারের সাবেক এই চৌকস কর্মকর্তার এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তিতে জেলায় সচেতন মহলে ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাকে নিয়ে পোস্ট দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, ভাগ করে নিচ্ছেন তার কর্মজীবনের নানা স্মৃতি ও অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়।
জানা গেছে, ১৯৮৫ ব্যাচের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলামের শেকড় রাজশাহী বিভাগের গাইবান্ধা জেলার গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের কুপতলা গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী এই কর্মকর্তা কর্মজীবনের শুরু থেকেই সততা ও নিষ্ঠার জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়ে আসছেন।
তিনি কক্সবাজারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৫তম জেলা প্রশাসক হিসেবে ২০০৬ সালের ২ আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের ১৩ মে পর্যন্ত কক্সবাজারের প্রশাসনের হাল ধরেন- যে সময়টি দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক চরম ক্রান্তিকাল হিসেবে চিহ্নিত। ১/১১-পরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সূচনালগ্নের জটিল ও সংবেদনশীল সময়েও তিনি কক্সবাজারে নিরপেক্ষ, দক্ষ ও দৃঢ় প্রশাসনিক ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করেন বলে সহকর্মী ও স্থানীয় মহলের অভিমত।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি খুলনা জেলায় সহকারী কমিশনার, বগুড়ার এনডিসি, রাজশাহীর চারঘাটের ইউএনও, জামালপুরের এডিসি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিবসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় কাটে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সচিব হিসেবে। ঢাকার খাল ও নদী দখলমুক্ত করা, সুয়ারেজ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণসহ জটিল নগর-পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সেই সময়কার অভিজ্ঞতা ঢাকায় পানিনিরাপত্তা ও সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পড়াশোনা ও ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ঠিকাদারি অনিয়ম, দুর্নীতি ও আইনি জটিলতা মোকাবিলায় তাকে আরও শক্ত অবস্থানে রাখবে বলে অভিমত তাদের।
বিভিন্ন সূত্রের দাবী- এই মেধাবী কর্মকর্তার দীর্ঘ কর্মজীবন সব সময় প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতিতে ভরপুর ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি চরম রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে তাকে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। যে কর্মকর্তা সততা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত থেকে জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা’ হিসেবে সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন, সেই তিনিই শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে মাত্র যুগ্মসচিব পদে থেকে অবসরে যেতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৫ সালে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রে বঞ্চিত ও অবহেলিত কর্মকর্তাদের প্রাপ্যতা ফিরিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নেয়, তার সুফল পান আমিনুল ইসলামও। প্রথমে তাকে অতিরিক্ত সচিব এবং পরবর্তীতে সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা তার দীর্ঘদিনের অবদানের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়।
জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার ভেতরে গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জমে থাকা অনিয়ম, দুর্নীতি ও নানা ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙা নতুন এমডি আমিনুল ইসলামের জন্য যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা-ও পরিষ্কার। কিন্তু প্রশাসনিক অভিজ্ঞদের মতে, মাঠ প্রশাসন থেকে মন্ত্রণালয় এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা- সব পর্যায়ে বহুমুখী দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, আইনি জ্ঞান ও কঠোর সততার মিশেলে তিনি এই পদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন।
নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর দৈনিক কক্সবাজারকে এক প্রতিক্রিয়ায় মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “ সরকার যে বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে, সেই বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার মাধ্যমে নগরবাসীর ভোগান্তি কমিয়ে গুণগতমানের পানি সেবা নিশ্চিত করাই হবে আমার একমাত্র লক্ষ্য।” তিনি কর্মজীবনে কক্সবাজারে স্মৃতি উল্লেখ করে জেলাবাসীর দোয়া কামনা করেন।
দীর্ঘদিন পর ঢাকা ওয়াসার মতো একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান একজন আইনজ্ঞ, মাঠ প্রশাসনের পোড়খাওয়া কর্মকর্তা এবং আপাদমস্তক সৎ প্রশাসককে শীর্ষ পদে পেল। তার নেতৃত্বে ওয়াসা দুর্নীতি ও অনিয়মের গলদ কাটিয়ে নাগরিক ভোগান্তি কমিয়ে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও মানুষের আস্থাভাজন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে- এমন প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্ট সকলের।