আবু মোরশেদ চৌধুরী (খোকা)
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলতে আলোচনা, মতভেদ ও গঠনমূলক সমালোচনার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু গণতন্ত্র কখনোই এমন কিছু নয়, যেখানে নিজের অধিকার চর্চা করতে গিয়ে অন্যের অধিকার, স্বস্তি কিংবা মানবিক মর্যাদাকে উপেক্ষা করা হবে।
বিষয়টা অনেকটা এমন,আপনি সারারাত উচ্চস্বরে মাইক বাজাচ্ছেন, অথচ পাশের বাসার অসুস্থ মানুষটি কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীর কষ্টটা ভাবছেন না। কিংবা গাড়িতে নিজের সিট আরাম করে পেছনে হেলিয়ে দিলেন, কিন্তু পেছনের যাত্রীটি কতটা অস্বস্তিতে পড়লেন, সেটি একবারও বিবেচনায় আনলেন না। আবার অনেক সময় দেখা যায়, আশপাশের পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই কেউ উচ্চস্বরে মোবাইলে কথা বলছেন। ছোট ছোট এসব আচরণই আসলে আমাদের সামাজিক সহনশীলতার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এসব অসচেতন ও অসহিষ্ণু আচরণ দিন দিন যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কখনো কখনো মনে হয়, দীর্ঘদিনের অনিয়মগুলোই ধীরে ধীরে আমাদের সমাজে নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় আরও একটি বিষয় চোখে পড়ে, নেতিবাচক শব্দচর্চার অস্বাভাবিক বিস্তার। “ভুয়া”, “বট”, “গুপ্ত” ইত্যাদি শব্দ এখন রাজপথ থেকে টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজনৈতিক মঞ্চ সর্বত্র অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অনেক সময় এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করছেন, আবার কখনো নিজেরাও এমন ভাষার শিকারও হচ্ছেন।
ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যদি বিদ্বেষ, অপমান আর ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, তাহলে সমাজে বিভাজন ছাড়া আর কিছুই বাড়ে না।
একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়তে শুধু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সংযত, তথ্যভিত্তিক ও মার্জিত বক্তব্যই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক দলের সমর্থকসহ আমাদের প্রত্যেকের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসা জরুরি। কারণ রাজনীতির পালাবদল হয়, ক্ষমতার পরিবর্তন হয়; কিন্তু অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষের সংস্কৃতি একসময় সবার জন্যই ক্ষতির কারণ, বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস বারবার সেটিই মনে করিয়ে দেয়।