কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ১২৫ বছর পর ৩টি প্যানেলের নির্বাচনে অংশগ্রহন নিয়ে সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। আইনজীবী সমিতির ইতিহাস ও আইনজীবী সমিতির নির্বাচনের ইতিহাস জানার জন্য সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা প্রবীণ আইনজীবীদের সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্থ হয়ে পড়েন। অনেক সময় ধরে লম্বা সাক্ষাৎকার নিলেও সম্পাদনা করে প্রচার করা হয়েছে মাত্র ৫%,বাদ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। এতে করে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টিও হয়েছে অনেক সময়। কক্সাবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির ইতিহাস বা নির্বাচনের ইতিহাস কেউ লেখেন নাই। অথচ সিভিল/ক্রিমিনাল আইনজীবীরা সকলেই লেখক। প্রতিদিন আর্জি, জবাব, আপিল, রিভিশন, জামিনের দরখাস্ত,জামিন বাতিলের দরখাস্ত ইত্যাদি অনেক কিছুই পেশার কারণে লেখে থাকেন। আইনজীবীরা বেতন/ভাতা পান না। সংশ্লিষ্ট মক্কেলের নিকট থেকে কাজের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক বা ফিস নিয়ে থাকেন তা দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। আইনজীবীরা যা লেখেন তা মক্কেলের কথা, যা বলেন তাও মক্কেলের কথা, সেই কথা সত্য হউক আর মিথ্যা হউক। প্রত্যেক আইনজীবী নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে যদি কিছু কিছু লিখতেন সবগুলি মিলিয়ে একটি ইতিহাস হয়ে যেত।
আমার মরহুম পিতা এডভোকেট ফজলূল করিম কক্সবাজার মহকুমা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে ১৯৪৯ সালে যোগদান করে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে মৃত্যু পর্যন্ত এই সমিতির সদস্য ছিলেন। তাঁর পুত্র হিসেবে আমি কোর্ট থেকে অনুমান দুইশত গজ দূরত্বে এন্ডারসন রোডের বাসায় আজ পযন্ত বসবাস করছি। আমিও আইনজীবী হিসেবে কক্সবাজার মহকুমা (পরে জেলা) আইনজীবী সমিতিতে ৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৯ সালে যোগদান করে আল্লাহর রহমতে আজ পর্যন্ত পিতার রেখে যাওয়া এন্ডারসন রোডস্থ বাসার চেম্বারে উকালতি করছি। কাগজপত্র থেকে যতটুকু জানা যায় ১৯০১ সালে কক্সবাজার মহকুমা আইনজীবী সমিতি উত্তর দক্ষিণ দিকে দুইটি বারান্দাসহ টিনের ছাউনীযুক্ত পাকা দেওয়ালের ঘরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন আইনজীবীদের সংখ্যাও খুব কম ছিল। আমরা যখন যোগদান করি তখন ৫০/৬০ সদস্য ছিলেন। আ্ইনজীবী সমিতিকে সাধারণ মানুষ চিনতেন ’উকিলখানা’ হিসেবে। তখনও বছরের শেষ দিকে একটি বার্ষিক সাধারণ সভাসহ ভোজসভার আয়োজন হত। নির্বাচনের কোন প্রচলন ছিল না। সিনিয়র একজন আইনজীবীকে বার্ষিক সভায় সভাপতি ও একজনকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হত। দুইজন পিয়ন ও একজন কেরানী নিয়ে আইনজীবী সমিতির হিসাব কিতাব,লাইব্রেরীর আইন সংক্রান্ত বইপুস্তক রক্ষণাবেক্ষন করা হত। সিনিয়র এডভোকেট চন্দ্র লালা সভাপতি ও এডভোকেট আবদুল জলিল অনেক বছর ধরে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
নির্বাচন প্রথা শুরু হয় ১৯৮০ সালে। প্রথম নির্বাচিত সভাপতি এডভোকেট নজির আহমদ ও নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুর আহমদ। সমমনা আইনজীবীরা বসে দুইটি প্যানেল করতেন এবং দুই প্যানেলের প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হত। এডভোকেট নজির আহমদদের এর প্যানেল ’ডান প্যানেল’ ও এডভোকেট নুর আহমদদের প্যানেলকে ’বাম প্যানেল’ বলা হত। রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী ডান-বাম প্যানেল বলা হত না। যেমন এডভোকেট আবু আহমদ ছিলেন মুসলিম লীগের নেতা মহকুমার সভাপতি। তিনি বাম প্যানেল থেকে ৮১-৮৪ সাল পর্যন্ত চার বার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাকে সমর্থন দিতেন আওয়ামী লীগ,জাসদ,ন্যাপ নেতা নুর আহমদ,জহিরুল ইসলাম,মওদুদ আহমদ,পীযুষ চৌধুরীরা। ডান প্যানেলের নেতা ছিলেন এডভোকেট ছালামতুল্লাহ। তিনি জামাতে ইসলামের নেতা ছিলেন। তার প্যানেলের সবকিছু হত এডভোকেট প্রফেসর নুর আহমদের বাসায়,তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগার। ডান প্যানেল থেকে আমি ৯ বার নির্বাচন করেছি। আমি ছাত্রজীবনে করেছিলাম ছাত্র লীগ। আমি কখনও জামাত,ইসলামী ছাত্রসংঘ,শিবির করি নাই। এডভোকেট ছালামতুল্লাহ ডান প্যানেলকে কখনও জামাতীকরণ বা রাজনৈতিকরণ করার চেষ্টা করেন নাই। তিনি বক্তিগতভাবে যেমন সৎ ছিলেন,রাজনৈতিকভাবেও সৎ ছিলেন। পরে রাজনৈতিকভাবে জামাত-বিএনপি ডান প্যানেল ও আ,লীগ,জাতীয় পার্টি, জাসদ সমমনারা বাম প্যানেলে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন করেছে। জামাতের সভাপতি হলে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির সভাপতি হলে জামাতের সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু আ,লীগ সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর গত বছর মবের ভয়ে আ,লীগ নির্বাচন না করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী নাম দিয়ে বোধহয় ৩জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনে জামাত ও বিএনপি ভিন্ন দুইটি প্যানেল করে সরাসরি নির্বাচন করে সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকসহ বেশীর ভাগ পদে বিএনপিপন্থীরা জয়ী হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে বিপুলভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় আ,লীগপন্থীরাও সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ চৌদ্দটি পদে নির্বাচন করেছে। তাদের কেউ বাধা দেয় নাই,কোন প্রার্থীর বাসায় পুলিশ যায় নাই। আ,লীগের আমলে সভপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আবুল কামাল ছিদ্দিকীর বাসায় পুলিশী হামলা হয় এবং তাকে না পেয়ে তার বড় ছেলে তানভির ছিদ্দিকী পামেলকে ( এখন এডভোকেট) কোন অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকে বেশ কিছু দিন হাজতবাস করতে হয়েছিল। সেদিকে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয় আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করা বা ক্ষমতার অপববহার না করার জন্য। জামাত ও বিএনপি গতবারের ধারাবাহিকতায় আলাদা প্যানেল দেওয়ায় কক্সবাজার বারের ১২৫ বছরের ইতিহাসে প্রথম বারের মত তিনটি প্যানেলে নির্বাচন হওয়ায় মিডিয়ার ও জনগণের বিশেষ উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল। এই বারের নির্বাচন সর্বোচ্চ অংশগ্রহনমূলক, শুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বহুল প্রশংসিত নির্বাচন হয়েছে । ৯৪% ভাগের অধিক আইনজীবী স্বাধীনভাবে ভোট দিয়েছেন। জাতীয় পার্টির নেতা ও গত সরকারের আমলের এপিপি সিনিয়র এডভোকেট আহমদ কবির প্রধান নিবাচন কমিশনার ও কয়েকজন আ,লীগপন্থী এবং সাধারণ আইনজীবী নিয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন সফলভাবে একটি সুন্দর উৎসবমূখর নির্বাচন আইনজীবীদের উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে। ফ্যাসিস্ট বা দোসর টেগ লাগিয়ে তাদের দূরে সরিয়ে না রেখে যোগ্য আইনজীবীদের উপযুক্ত কাজে লাগিয়ে বিগত নির্বাহী কমিটি প্রশংসায় ভাসছে। বেলা বারটার সময় আমি যখন ভোট দিতে যাই তখন প্রবেশমুখে কয়েকশত আইনজীবী দুই লাইন হয়ে দাড়িয়ে প্রার্থীরা নিজে বা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারপত্র হাতে দিয়ে ভোট চাইছিলেন। আমি প্রথমেই ঘোষণা করি তোমরা যে যা বল ভাই আমি ৪৯জন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী মাত্র দুইজন মহিলা আইনজীবীকে আমার মেয়ে,বোন,নাতি মনে করে আগে ভোট দেব। তখন একজন প্রার্থী হাত ধরে অনুনয় করে বলেন স্যার আমি আগে দুইবার পরাজিত হয়েছি। তখন আমি দাড়িয়ে বললাম তুমি কার সামনে দুইবার পরাজয়ের কথা বলছো যে তিনবার সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে পাঁচবার পরাজিত হয়েছে তার সামনে। আমি গর্বভরে বলছি আমি সভাপতি নিবাচিত হওয়ার আগে ৫বার সাধারণ সম্পাদক পদে পরাজিত হয়েছিলাম। তাতে কোন লজ্জা নাই। আমি বার বার পরাজিত হয়েছি খুব যোগ্য ও আমার চেয়ে সিনিয়র এডভোকেট নুর আহমদ,আবুল কালাজ আজাদ-১,আবুল কালাম আজাদ-২,পীযুষ কান্তি চৌধুরী ও দিলীপ কুমার আচার্যের কাছে। গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল নির্বাচন। নির্বাচনে দুইটি হাত হল জয় ও পরাজয়। প্রতিদ্বন্দ্বী সকল প্রার্থী জয়ী হতে পারে না,এক বা একাধিক প্রার্থী অবশ্যই পরাজিত হবেন। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি পরাজিত হতে পারি,কিšু‘ কোন অবস্থাতেই গণতন্ত্রকে পরাজিত হতে দেব না। এই বারের নির্বাচনে আ,লীগপন্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টি পদে,জামাতপন্থীরা ৬টি পদে,ক্ষমতাসীন বিএনপিপন্থীরা ৪টি পদে। বিগত নির্বাহী কমিটি খুব সমালোচিত হয়েছে। বিশেষ করে বার্ষিক ভোজের চরম অব্যবস্থাপনা নতুন নজির সৃষ্টি করেছে। আমি যাই নাই তবে শুনেছি। আমার মত অসুস্থ,বয়স্ক প্রায় ৩০জন প্রতি বছর যান না। বার্ষিক ভোজের জন্য জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়,তাই তালিকা করে খাবারপেকেট বাসায় পৌছে দেওয়া হয়। অসুস্থ,বয়স্ক আইনজীবীরা শারিরীক কারণে খেতে না পারলেও বারের পেকেট পেয়ে খুশী হন, এই ভেবে যে আমাকে মনে রাখা হয়েছে,সম্মানিত করা হয়েছে। এইবারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয় নাই। যারা সশরীরে উপস্থিত ছিলেন তারাও সকলে খাবার না পেয়ে চরম অসন্তোষ্টি প্রকাশ করে প্রকাশ্যে বলেছেন আমার টাকা দেওয়া খাবার পাওয়া আমার অধিকার,হক। আপনারা ৯/৬ করে আইনজীবীদের বার্ষিক ভোজসভাকে কলংকিত করেছেন। তাই গত কমিটিতে থাকা আক্তার উদ্দিন হেলালী বতীত কেউ নিবাচিত হন নাই,এমন কি সদস্য পদেও। জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সামান্য সদস্য আবদুল মান্নান সভাপতি ,আবদুল্লাহ সহসভাপতি নির্বাচিত হলেও বড় নেতারা সদস্য পদে নির্বাচিত হতে পারেন নাই। অন্যকে সম্মান না করলে আপনিও সম্মান পাবেন না। এই বারের নির্বাচনে খুব খারাপ লাগার মত খবর হল নির্বাচনের কয়েক দিন আগে থেকে টাকার লেনদেন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাপক প্রচার হয়েছে যা জনসমক্ষে আইনজীবীদের ভাবমূর্তি, মানমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে। প্যানেল রাজনীতিকরণ হওয়ার আগে টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়া-নেওয়ার লজ্জাজনক বাপার ছিল না,প্রচারও ছিল না। কেবলমাত্র আইনাংগনে দলীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে প্যানেল দেওয়া নিষিদ্ধ করা না হলে আত্মসম্মান,নৈতিকতা ও সততা নিয়ে সজাগ আইনজীবীরা আস্তে আস্তে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া থেকে দূরে সরে গেলেও এই মারাত্মক দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
আমাদের কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির গর্ব করার মত গৌরবের বিষয়ও অনেক আছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এই অঞ্চল থেকে প্রথম সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট জহিরুল ইসলাম। পাকিস্তান আমলে কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রী হয়েছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমদ(এডভোকেট) এই বারের সদস্য। এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট ফিরোজ আহমদ চৌধুরী। ১৯৭০ এর নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট নুর আহমদ,প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এডভোকেট জহিরুল ইসলাম। কক্সবাজার মহকুমা থেকে প্রথম জেলা জজ হয়েছিলেন এই বারের সদস্য আবু বকর ছিদ্দিকী। প্রথম সুপ্রীমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হয়েছিলেন এই বারের সদস্য বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী(রামু)। এখনও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি আছেন বিচারপতি মোঃ আলী (টেকনাফ)। সিআরপিসি সহ অনেকগুলি আইন বই এর বিখ্যাত লেখক এডভোকেট জহিরুল হকও (চকরিয়া) এই বারের সদস্য ছিলেন। পরাজিত প্রার্থীদের অভিনন্দন। নির্বাচিত কর্মকর্তাদের অভিনন্দন ও শুভ কামনা।