চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক-দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের বহু অংশজুড়ে লুকিয়ে আছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। বিশেষ করে ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপ্রশস্ত সড়ক ও ত্রুটিপূর্ণ অংশে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এবার সেই ঝুঁকি কমাতে শুরু হয়েছে সড়ক প্রশস্তকরণ, ৪ লেনে উন্নীত ও বাঁক সরলীকরণের কাজ। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সড়ক বিভাগ।
চট্টগ্রামের চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকা; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুর্ঘটনার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সড়ক বিভাগ। আর এই জাঙ্গালিয়া এলাকায় দুর্ঘটনা কমাতে এখন এখানে চলছে সড়ক প্রশস্ত ও চার লেনে উন্নীত করার কাজ।
সরজমিনে দেখা যায়- জাঙ্গালিয়া এলাকায় সড়কের পাশে চলছে গাছ কাটার কাজ, ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। রোলার দিয়ে মাটি শক্ত করার পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত করতে ফেলা হয় মাটি ও ইট। চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের আওতায় জোরগতিতে এগিয়ে চলছে ৯০০ মিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজ।
চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ (দক্ষিণ)-এর রোলার অপারেটর মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, কক্সবাজারমুখী চার লেন সড়ক উন্নয়ন কাজ চলছে। প্রায় এক মাস ধরে কাজ করছি। বর্তমানে নির্ধারিত অংশের একটি লেনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে।
মোহাম্মদ রিয়াজ আরও বলেন, বর্তমানে রোলার দিয়ে মাটি শক্ত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি সড়কের বর্ধিত অংশে মাটি ও ইট ফেলে ভরাটের কাজও করা হচ্ছে।
এদিকে শুধু চট্টগ্রাম অংশেই নয়, থেমে নেই কক্সবাজার অংশের কাজও। জোরেশোরে চলছে আরও ৭০০ মিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কার্যক্রম। পাশাপাশি চকরিয়া কলেজ, বরইতলী ও ইনানী এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ৬টি বাঁককে করা হচ্ছে সোজা।
সড়ক বিভাগ বলছে, কক্সবাজার অংশের ৬৬ কিলোমিটার সড়ক ২২ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হবে। এরই মধ্যে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও উন্নয়ন কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করছে সরকার।
সড়ক বিভাগ কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকনউদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কে মোট ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যেসব বাঁক সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরলীকরণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাঁক চিহ্নিত করে সড়কটিকে যতটা সম্ভব সোজা ও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মহাসড়কের এই অংশ বর্তমানে প্রায় ৬ দশমিক ৭ মিটার বা ২২ ফুট প্রশস্ত। তুলনামূলক সরু হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সার্ভিস লেনসহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব স্থানে দুর্ঘটনার হার বেশি, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু অংশে সড়কের প্রস্থ ৬ দশমিক ৭ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার বা প্রায় ৩৪ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। জাঙ্গালিয়া এলাকায় কক্সবাজার সড়ক বিভাগের আওতায় ৭০০ মিটার এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের আওতায় আরও ৯০০ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। অর্থাৎ একই এলাকায় মোট প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিটার সড়ক চার লেনে রূপান্তর করা হবে।
এছাড়া বাকি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণের অংশ হিসেবে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জাঙ্গালিয়া থেকে এসএমঘাট সেতু পর্যন্ত সড়ককে ১০ দশমিক ৩ মিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানান তিনি।
চালক, যাত্রী ও স্থানীয়দের অভিযোগ; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক বহু আগেই হারিয়েছে তার ধারণক্ষমতা। অপ্রশস্ত সড়ক, বিভাজক না থাকা, লবণবাহী ট্রাকের পানি পড়ে পিচ্ছিল সড়ক, বেপরোয়া গতি আর অদক্ষ চালকদের প্রতিযোগিতায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। তার ওপর অনুমোদনহীন ফিটনেসবিহীন যান, ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচলে সামান্য অসাবধানতাতেই ঘটছে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ।
হানিফ পরিবহনের চালক রুহুল আমিন বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে গাড়ি চালানোর সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি তৈরি করে ইজিবাইক, মিশুক, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। এর পাশাপাশি লবণবাহী যানবাহনের কারণেও প্রায়ই দুর্ঘটনার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসব কারণে মহাসড়কে গাড়ি চালাতে সবসময় আতঙ্ক নিয়ে থাকতে হয়।
শ্যামলী পরিবহনের চালক ইদ্রিস আলী বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে এখনো অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে। বিশেষ করে চুনতি, জাঙ্গালিয়া, কক্সবাজার প্রবেশ গেইট, ইনানী, বরইতলী, ডুলাহাজারা ও ফাঁসিয়াখালী এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি। এসব স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সরলীকরণের কাজ চলছে। তবে শুধু বাঁক ঠিক করলেই দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমবে না। কারণ এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ অনেক বেশি এবং বর্তমান সড়ক সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো সক্ষম নয়। তাই দুর্ঘটনা কমাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে অবশ্যই ৬ লেনে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
চকরিয়ার বাসিন্দা এনামুল সিকদার বলেন, “বিশেষ করে রাত তিনটা থেকে সকাল ১০টা-১১টার মধ্যে এই সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ এ সময় লবণবাহী ট্রাক, মাছবাহী যানবাহনসহ ভারী পরিবহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। ফলে সড়কে যানজট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িয়ে দেয়।”
শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী ইয়াকুব আলী বলেন, “ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়ক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। দেশের লাক্সারি পরিবহন খাতের সবচেয়ে আধুনিক ও বড় বড় বাসগুলো এখন এই রুটে চলাচল করছে। তাই সড়কটির গুরুত্বও অনেক বেশি।
কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রায় ২০ বছর আগে সড়কটি যেমন ছিল, এখনও অনেকাংশে তেমনই রয়ে গেছে। আগে যেখানে ছোট বাস চলাচল করত, এখন সেখানে বড় আকারের আধুনিক বাস চলাচল করছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী সড়কের উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। আমরা যখন এই সড়কে যাত্রা করি, তখন সবসময়ই এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে-মনে হয় জীবন ঝুঁকি নিয়েই পথে বের হয়েছি।”
কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক ইমতিয়াজ উদ্দিন মিজান বলেন, “সময় স্বল্পতার কারণে বেশিরভাগ সময়ই আমাদের বাসে যাতায়াত করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না, তাই বাধ্য হয়ে সড়কপথই বেছে নিতে হয়।
তবে এই পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি খুব বেশি-এ বিষয়টি সবসময় আমাদের মনে ভয় তৈরি করে। আমরা যখন যাত্রা করি, তখন পরিবারের সদস্যরাও উদ্বিগ্ন থাকেন। তারা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবো কি না তা নিয়ে।”
এদিকে, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলছে- চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় বা আট লেনে উন্নীত করা গেলে কমবে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, পর্যটননির্ভর জেলা হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রতিদিন কক্সবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই তুলনায় সড়কগুলো এখনো অনেক সংকীর্ণ। ফলে অতিরিক্ত যানচাপের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, সড়কগুলোকে ছয় বা আট লেনে উন্নীত করা গেলে যানজট ও দুর্ঘটনা-দুটিই অনেকাংশে কমে আসবে।
বিআরটিএর দেয়া তথ্য মতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কে শুধু ২০২৫ সালেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জনের বেশি মানুষ। আহত হয়েছেন প্রায় চারশো জন।