মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হঠাৎ গোলাগুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তে। পতাকা উড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানানোর পাশাপাশি কাঁটাতার ঘেঁষে অবস্থান জোরদার করেছে তারা। রয়েছে নারী সদস্যও।
সীমান্তবাসীর দাবি, একমাস পর সোমবার সন্ধ্যায় আধাঘণ্টা গোলাগুলির পর মঙ্গলবার সকাল থেকে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অবস্থান নিয়েছে আরাকান আর্মি।
এদিকে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সতর্ক রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বান্দরবানের জলপাইতলী অংশ। এক মাস আগেও কাঁটাতার ঘেঁষে মিয়ানমারের ভেতরে ছিল আরাকান আর্মির ফাঁকা আস্তানা। এখন সেখানে উড়ছে পতাকা। অবস্থান নিয়েছে পুরুষ ও নারী সদস্যরা। জলপাইতলীর পাশাপাশি মিয়ানমারের ঢেকুবনিয়া ফকিরপাড়া ক্যাম্পেও অবস্থান নিয়েছে আরাকান আর্মি। মঙ্গলবার দুপুরে যা ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাদের উপস্থিতি।
বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তের পূর্বপাড়া। সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ গজ দূরে বসবাস হামিদুল হকের। সোমবার সন্ধ্যায় তার বাড়ির বিপরীতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে হয় গোলাগুলি। এরপর থেকেই পরিবার নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটছে তার।
হামিদুল হক বলেন, সোমবার মাগরিবের নামাজের পরপরই হঠাৎ করে সীমান্ত এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়। জলপাইতলী এলাকা এবং ঢেকুবুনিয়ার ক্যাম্পসংলগ্ন দুই দিক থেকেই এলোপাতাড়ি গুলির আওয়াজ ভেসে আসে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ওই এলাকায় মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির তেমন কোনো উপস্থিতি না থাকলেও প্রায় এক মাস পর তাদের অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হঠাৎ এই গোলাগুলির ঘটনায় ধারণা করা হচ্ছে, কোনো পক্ষ তাদের অবস্থান শনাক্ত করে ফেলায় তাৎক্ষণিকভাবে সংঘর্ষ বা সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছে। বর্তমানে আরাকান আর্মির সদস্যরা আস্তানায় অবস্থান নিয়েছে। সদস্য সংখ্যাও বেড়েছে।
হামিদুল হক আরও জানান, তুমব্রু থেকে ঘুমধুম বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত পুরো সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে কৃষক, মাছচাষি ও খামারিরা তাদের দৈনন্দিন কাজে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি যারা প্রতিদিন গরু চরাতে মাঠে যেতেন, তারাও এখন নিরাপত্তা শঙ্কায় ঘর থেকে বের হতে দ্বিধা করছেন।
সীমান্তের জলপাইতলীর বাসিন্দারাও আছেন চরম উদ্বেগে। গোলাগুলির পর খেত-খামার ও মৎস্য ঘেরে নেই স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য। সীমান্তবাসীর দাবি, পিলার ৩১ ও ৩২ এলাকায় গোলাগুলির পর থেকেই আস্তানায় অবস্থান জোরদার করেছে আরাকান আর্মি।
সীমান্তের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম (৮৬) বলেন, সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই গুলির শব্দ শুরু হয়। তখন চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরপর গুলির শব্দে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এমন সময় ঘর থেকে বের হয়ে অন্য স্থানে চলে যায়। পরে মঙ্গলবার সকালে ঘরে ফিরে আসি। খুব ভয়ে পেয়েছি।
ইজিবাইক চালক রফিক (৩৯) বলেন, গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুরু হয়। ভয়ে যাত্রীসহ নিরাপদ আশ্রয় ছিলাম ঘন্টাখানেক। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে ফেরার সময়ও পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নুরুল আবছার (২৮) বলেন, তার বাড়ি একেবারে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে কাছাকাছিতে অবস্থিত। হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার কাছে মনে হচ্ছিল, যেন গুলিগুলো তার বাড়িতেই হচ্ছে। তিনি জানান, কয়েকটি গুলি তাদের বাড়ির পাশেই এসে পড়ে।
এ অবস্থায় তারা চরম আতঙ্কে পড়ে যান এবং নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতিও নেন। প্রায় ২০ মিনিট পর গুলাগুলি কিছুটা থেমে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পরে তারা বুঝতে পারেন, দুটি গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে এবং সেই সময়েই তাদের বাড়ির দিকে কয়েকটি গুলি এসে পড়েছিল।
মো. সায়মন (১৮) বলেন, যেহেতু বাড়ি সীমান্ত এলাকায়, তাই আতঙ্কের মধ্যে থাকাটা স্বাভাবিক। সীমান্তে গোলাগুলির সময় প্রায় ১০০ রাউন্ডের মতো গুলির শব্দ শোনা গেছে, তবে কী ঘটেছে তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।
এদিকে, সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। বাড়ানো হয়েছে টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাহিনীটির দাবি-মিয়ানমারের অভ্যন্তরের এ ঘটনা তাদের নিজস্ব বিষয়, সীমান্তে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই।
কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত গোলাগুলির ঘটনা সম্পূর্ণভাবে সে দেশের নিজস্ব বিষয়। সেখানে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে, যারা নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে জড়াতে পারে।
তিনি জানান, সম্প্রতি যে ঘটনাটি ঘটেছে তা বাংলাদেশের সীমানা থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভেতরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘটিত হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বিজিবির টহল ও নজরদারি সবসময়ই সক্রিয় রয়েছে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় তারা সর্বদা সজাগ ও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছে।
বান্দবানের ঘুমধুম সীমান্ত ঘেঁষে বসবাস করে দুই শতাধিক পরিবার।