মাহমুদ দিদার
কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলের ঝোড়ো, উদ্দাম জলপথ পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসে একটি শিশু। গন্তব্য তার পেকুয়ার বাংলাদেশ নৌবাহিনী স্কুল। বয়সে ছোট। অথচ প্রতিদিনের পথচলায় তার সংকল্প বড়। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী রেহনুমা নুরেন হক। ট্রলারে চড়ে কুতুবদিয়া থেকে আসে সে। জানা যায়, এক দিনও ক্লাস মিস করেনি।
কেন এই দুরন্ত জলপথ পেরিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসে রেহনুমা? কী এমন টান তাকে প্রতিদিন ফিরিয়ে আনে এই শিক্ষাঙ্গনে? উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে একটি বিদ্যালয়, একজন স্বপ্নবান অধ্যক্ষ এবং উপকূলের এক জনপদে শিক্ষার নতুন সম্ভাবনার গল্প।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামায়, লবণমাঠের বিস্তারের পাশে, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। এর নির্মাণযাত্রার সঙ্গে যুক্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহ। তাঁর কাছে বিদ্যালয় পরিচালনা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; শিশুদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিকতায় গড়ে তোলারও এক আন্তরিক অঙ্গীকার।
২৫ জুলাই ২০২৫। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহর দায়িত্ব গ্রহণ একই দিনে। সূচনালগ্নে সামনে ছিল ধুলোমাখা প্রান্তর, আর ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ। বিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি। শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিখবে, নিজের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ পাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হবে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহর পেশাগত জীবনেও রয়েছে শিক্ষা ও শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা। ২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শিক্ষা শাখায় কমিশন লাভ করেন। বাংলাদেশ নেভাল একাডেমিতে শিক্ষক হিসেবে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি হাইড্রোগ্রাফিক প্রশিক্ষণ, জরিপ এবং নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশানোগ্রাফিক কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কার্টোগ্রাফি-সংক্রান্ত কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। শিক্ষকতা, বিজ্ঞানভিত্তিক অধ্যয়ন ও নৌবাহিনীর শৃঙ্খলানির্ভর কর্মপরিবেশের অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহর শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে শিশুর সামগ্রিক বিকাশ। পরীক্ষায় ভালো ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, চিন্তাশক্তি, যোগাযোগদক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দুই সন্তানও এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। নিজের সন্তানদের শিক্ষাজীবনকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রাখার বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত আস্থার একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ২৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পর্যায়ক্রমে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভাষা, সৃজনশীলতা ও আত্মপ্রকাশের দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাবলিক স্পিকিং, রিডিং কম্পিটিশন, ওয়ার্ড বি কম্পিটিশন, ক্লাব কার্যক্রম ও সাংস্কৃতিক আয়োজন তার অংশ। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি Tense শেখানোর উদ্যোগও রয়েছে। এসব চর্চায় শিশুরা নতুন শব্দ শেখে, বই পড়ায় আগ্রহী হয় এবং নিজের বক্তব্য প্রকাশের সুযোগ পায়। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা তাদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে।
বিদ্যালয়টির আরেকটি বৈশিষ্ট্য জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা। ডাইনিং টেবিলের শিষ্টাচার, সামাজিক আচরণ, কথোপকথনের কৌশল, পথচলার নিয়ম এবং সময় ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে 'Vote of Thanks' দেওয়ার অনুশীলন শিক্ষার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়া ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভিজ্ঞতা দেয়। হাতে-কলমে ব্যাংকিং লেনদেনের পরিচিতি তাদের অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেয়।
প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি ওষুধের লেবেল পড়া, ইমালশন ও সাসপেনশন এবং পরিমাপসংক্রান্ত বিষয় শেখানোর কথাও রয়েছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে। এসব বিষয় বয়সোপযোগী পদ্ধতিতে ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে শেখানো জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অংশ হিসেবে নামাজের নিয়ম শেখানোর উদ্যোগ রয়েছে। সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার চর্চাও শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের সঙ্গে যুক্ত। এই শিক্ষার লক্ষ্য শিশুদের দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা।
বিদ্যালয়ের 'Fun with Principal' কার্যক্রম অধ্যক্ষ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহজ, প্রাণবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে। সকালে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দৌড়ান লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহ। শরীরচর্চার এই অভ্যাস শিশুদের সুস্থ জীবনযাপন ও নিয়মিত অনুশীলনে উৎসাহিত করে। জন্মদিন উদ্যাপন, চড়ইভাতি ও দলগত আয়োজনেও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। আনন্দের মধ্য দিয়ে শেখার এই পরিবেশ বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
মগনামার জীবন লবণমাঠ, জলপথ ও মানুষের শ্রমের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানকার লবণচাষি, টমটমচালক, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানেরা এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য স্কুলবাসের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে বিভিন্ন পেশার পরিবারের সন্তানদের জন্য এখানে শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই উপকূলীয় জনপদে শিক্ষার সুযোগ মানে বহু পরিবারের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ। কোনো শিশু যেন জন্মস্থান বা পারিবারিক পেশার কারণে নিজের স্বপ্ন সীমিত করে না ফেলে এটাই হওয়া উচিত শিক্ষার বড় অঙ্গীকার। মানসম্মত পাঠদান, দক্ষতা বিকাশ এবং শিক্ষার্থীর প্রতি নিয়মিত মনোযোগ সেই অঙ্গীকার পূরণের ভিত্তি।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টির সামনে এখন আরও বড় হওয়ার পরিকল্পনা। প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হলে শিক্ষার্থীরা একই প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনার সুযোগ পাবে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষার মান, উপযুক্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
একদিন এই বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী চিকিৎসক হবে, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, গবেষক কিংবা উদ্যোক্তা। কেউ হয়তো ফিরে আসবে নিজের জনপদে, মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবে অর্জিত জ্ঞান। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আজকের শেখা, অনুশীলন ও মূল্যবোধের ওপর।
কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেল পেরিয়ে রেহনুমার প্রতিদিনের যাত্রা তাই একটি শিশুর অধ্যবসায়ের গল্প। একই সঙ্গে এটি উপকূলের এক জনপদে শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ ও নতুন সম্ভাবনার পরিচয় দেয়।
একটি বিদ্যালয়ের পরিচয় শুধু তার ভবনে নয়, তার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্রে। আর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার প্রিন্সিপাল এম শহীদুল্লাহর নেতৃত্বের সার্থকতা হবে এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ গড়ে তোলায়, যেখান থেকে শিশুরা নিজেদের যোগ্যতায় বড় হবে, মানবিক মানুষ হয়ে উঠবে এবং একদিন অন্যের পথও আলোকিত করবে।
লেখকঃ ফিল্ম মেকার। ভিজুয়াল স্ট্র্যাটেজিস্ট।