কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা। উচ্ছেদ অভিযানের জন্য এক্সকাভেটর, বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। মাইকিং করে স্থাপনা সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হলেও ব্যবসায়ীরা তা না সরিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থান নেন। তাদের দাবি, বালিয়াড়িতে তারা বৈধভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাই বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়ি। সাগরতীরে প্রবেশের ঠিক আগ মুহূর্তে বালিয়াড়ির দু’পাশে গড়ে উঠেছে শামুক-ঝিনুক, বার্মিজ পণ্য ও নানা ধরনের আচারের প্রায় পাঁচশো দোকানপাট।
শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুর ১টায় তৃতীয় দিনের মতো অভিযানে সৈকতের বালিয়াড়িতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সুগন্ধা পয়েন্টে আনা হয় এক্সকেভেটর। সঙ্গে উপস্থিত ছিল বিপুল সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। অভিযানের শুরুতেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায় ব্যবসায়ী ও প্রশাসন। পরে ব্যবসায়ীরা সরে গেলে স্থাপনাগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এরপর বালিয়াড়ির স্থাপনা সরিয়ে নিতে ব্যাপক মাইকিং শুরু করেন বিচকর্মীরা। কিন্তু তাতেও দোকান সরাননি অনেক ব্যবসায়ী। বরং নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে অবস্থান নেন তারা। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে আবারও মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে তাতেও অনড় থাকেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি-বালিয়াড়িতে তারা বৈধভাবেই ব্যবসা করছেন। উচ্ছেদ না করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তারা।
সুগন্ধা পয়েন্টের আচারের দোকানদার রশিদ আহমদ বলেন, আমরা প্রতি বছর সরকারের কাছে কার্ড নবায়ন করে রাজস্ব দিয়ে এখানে মৌসুমি ব্যবসা করি। ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসার জন্য টাকা বিনিয়োগ করেছি। হঠাৎ করে দোকান তুলে দিতে বলা হলে আমরা বিপদে পড়ব। এই দোকানের আয়ে আমাদের পরিবার চলে। এখন লাখ লাখ টাকা ঋণ, এসব ঋণ কিভাবে পরিশোধ করব আর সংসার বা কিভাবে চালাবো।
বার্মিজ সামগ্রীর দোকানদার নুরুল বশর বলেন, গত প্রায় ১৮ বছরে চার-পাঁচবার করে মিলিয়ে প্রায় ৮০ থেকে ১০০ বার আমরা উচ্ছেদের আতঙ্কের মধ্যে পড়েছি। অনেক সময় উচ্ছেদ করা হয়, আবার পরে বসতেও দেওয়া হয়-এভাবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির মধ্যে ব্যবসা করে আসছি।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের অধীনে আমাদের একটি বৈধ কার্ড রয়েছে এবং আমরা নিয়মিত রাজস্ব দিয়ে তা নবায়ন করি। দুই বছরের জন্য কার্ড নবায়ন করতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা রাজস্ব দিতে হয়। বর্তমানে আমাদের কার্ডের মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় তিন মাস বাকি রয়েছে। তাই কার্ডের মেয়াদ থাকা অবস্থায় উচ্ছেদ না করে বিষয়টি বিবেচনা করার দাবি জানান তিনি।
ব্যবসায়ী মোরশেদ আলম বলেন, সৈকতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা আমরা জানি এবং প্রশাসন সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে। তবে আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করছি, এখানে প্রায় পাঁচ থেকে দশ হাজার পরিবার এই ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, রমজানের সময় হঠাৎ করে এভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে-এটা আমরা কল্পনাও করিনি। আমাদের মতো অনেক পরিবারের জীবিকা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
ব্যবসায়ী ফরিদ বলেন, এই সৈকতেই আমি ব্যবসা করি এবং এই আয়ের ওপরই আমার পুরো পরিবার নির্ভরশীল। আমার ছেলে–সন্তানদের পড়াশোনা চলছে, আর ব্যাংকে প্রায় ১২ লাখ টাকার ঋণ আছে। প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। এখন যদি দোকান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এই টাকা আমি কোথা থেকে দেব—সেটা ভেবে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।
ফরিদ আরও বলেন, এই পবিত্র রমজান মাসে আমাদের মতো মানুষের জীবিকা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে আমরা বড় সংকটে পড়ে যাব। তাই বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করে আমাদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
সুগন্ধা পয়েন্টের ঝিনুক ব্যবসায়ী আজিজুল হাকিম তারেক বলেন, দীর্ঘ এক মাস দোকানপাট বন্ধ থাকায় রমজানে পর্যটক না আসায় আমরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি। পরে ব্যবসার আশায় আবার নতুন করে দোকানে মালামাল তুলেছি। এমন অবস্থায় উচ্ছেদের খবর শুনে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। এই দোকানগুলোই আমাদের পরিবারের স্বপ্ন ও জীবিকার একমাত্র ভরসা। তাই উচ্ছেদের আগে আমাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান তিনি।
এদিকে অভিযানটি দুপুর ১টায় শুরু হলেও বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয়নি। বেশ কিছুক্ষণ সুগন্ধা পয়েন্ট তথ্য ও অভিযোগ কেন্দ্রে অবস্থান করেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মনজু বিন আফনান, আজিম খান, মো. নাজমুল হাসান নাঈম, মো. তরিকুল ইসলাম ও দীপ্ত সাহা।
তবে প্রশাসন বলছে, রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বেচ্ছায় স্থাপনা সরিয়ে না নিলে সেগুলো গুড়িয়ে দেওয়া হবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মনজু বিন আফনান বলেন, আমাদের চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় শনিবার সুগন্ধা পয়েন্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এখানে যেসব ব্যবসায়ী অবস্থান করছেন, তাদের বিপুল পরিমাণ মালামাল ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তারা তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু সময় প্রার্থনা করেন।
তাদের সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এবং মানবিক দিক বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ তাদের রবিবার (১৫ মার্চ) সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা কর্তৃপক্ষের কাছে অঙ্গীকার করেছেন যে, রবিবার সকাল ১০টার মধ্যে তারা সম্পূর্ণ মার্কেট এলাকা খালি করে দেবেন।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ীরা তাদের দোকানপাট ও মালামাল সরিয়ে নিয়ে এলাকা পরিষ্কার করে স্থান ত্যাগ করবেন। তবে যদি তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থান খালি না করেন বা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন, তাহলে রবিবার সকাল ১০টার পর থেকেই প্রশাসন পুণরায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পর গত দুই দিনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৩০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে প্রশাসন।