স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর অবশেষে ঘুচল কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আক্ষেপ; বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই জনপদ পেল ইতিহাসের প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী। সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শপথ নিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে।
কক্সবাজারবাসী মনে করছেন, বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথবাক্য পাঠের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতাই সম্পন্ন করেননি, বরং টেকনাফ থেকে চকরিয়া পর্যন্ত লাখো মানুষের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। সচিবালয়ের যে কক্ষে বসে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ফাইলে চূড়ান্ত স্বাক্ষর পড়ে কিংবা কেবিনেট মিটিংয়ে যেখানে দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়- সেই ক্ষমতার কেন্দ্রে এখন কক্সবাজারের জোরালো প্রতিনিধিত্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের এই পরীক্ষিত ও অভিজ্ঞ নেতার ওপরই সর্বোচ্চ আস্থা রেখেছেন। সন্ধ্যায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সাগরপাড়ের রাজনীতিতে এক নতুন সূর্যোদয়ের সূচনা হলো।
সালাহউদ্দিন আহমদের নাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে কক্সবাজারের দৃশ্যপট। বিশেষ করে তাঁর নির্বাচনী এলাকা কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া)'র চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকায় দলের নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরই গ্রাম থেকে শহরে শুরু হয় মিষ্টি বিতরণ, পাড়া-মহল্লায় বের হয় আনন্দ মিছিল। স্থানীয়দের মতে, সালাহউদ্দিন আহমদ কেবল একজন রাজনীতিক নন, তিনি এই জনপদের উন্নয়নের এক বিশ্বস্ত নাম।
রোহিঙ্গা সংকট, পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়ন এবং ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে কক্সবাজার যখন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্ববহ, ঠিক তখনই জেলার নিজস্ব সন্তান ও স্থায়ী কমিটির সদস্যের এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্তি জেলার উন্নয়নের সমীকরণ বদলে দেবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ নাগরিকরা। সাধারণ মানুষের আবেগ ছিল বাঁধভাঙা; প্রবীণ নাগরিকদের মতে, উন্নয়নের মূল স্রোত এবার সরাসরি কক্সবাজারের দিকে আসবে। এদিকে তাঁকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পেয়ে নিজেদের আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেছেন কক্সবাজারের অপর তিনটি সংসদীয় আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও।
জানা গেছে, বিএনপির ভেতরে সালাহউদ্দিন আহমদ বরাবরই পরিচিত একজন ঠান্ডা মাথার প্রশাসনিক রাজনীতিক হিসেবে। তাঁর এই ঈর্ষণীয় উত্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক সংগ্রামী অতীত, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন পেকুয়ার সিকদারপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে জন্মগ্রহণ করা সালাহউদ্দিন আহমদ মেধা ও যোগ্যতায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৮৫ সালে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে বগুড়ায় সিনিয়র সহকারী সচিব থাকাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে রাজনীতির টানে ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় হন। প্রশাসনের ভেতরের কলকব্জা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা এবং আইনি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য থাকায়, বর্তমান সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারেক রহমান তাঁকেই সবচেয়ে যোগ্য মনে করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করতে হয়।
রাজনীতিতে তাঁর ক্যারিয়ারের গ্রাফ সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ২০০১ সালে জোট সরকার আমলে তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। সেই সময়েই তিনি কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। আজকের চকরিয়া-পেকুয়ার যে উন্নত গ্রামীণ অবকাঠামো, মাতামুহুরী নদীর ওপর সেতু এবং দুর্গম জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ- সবই তাঁর হাতে গড়া। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টাতেই ২০০২ সালে পেকুয়া একটি স্বতন্ত্র উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, তিনি কেবল কথার ফুলঝুড়ি ছোটান না, ফাইলের কাজও বোঝেন উত্তম মুন্সিয়ানায়। ভদ্রোচিত আচরণ ও পরিশীলিত রাজনীতির ধারক হিসেবে পরিচিত সালাহউদ্দিন আহমদ চরম ক্ষমতার সময়েও প্রতিপক্ষের সঙ্গে কখনোই দমন-পীড়নের পথে হাঁটেননি, যা তাঁকে দলমত নির্বিশেষে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
তবে সালাহউদ্দিন আহমদের জীবনের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায় ছিল ২০১৫ সাল। আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ১০ মার্চ উত্তরার বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। টানা ৬২ দিন তিনি নিখোঁজ ছিলেন। পরিবার ও দল যখন আশা প্রায় ছেড়ে দিচ্ছিল, তখন মেঘালয়ের শিলংয়ে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় তাঁর সন্ধান মেলে।
এরপর শুরু হয় অন্য এক লড়াই। অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতীয় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০১৮ সালে তিনি শিলংয়ের আদালত থেকে বেকসুর খালাস পান। কিন্তু আইনি জটিলতায় তাঁকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভারতেই বাধ্যতামূলক প্রবাস জীবন কাটাতে হয়। দীর্ঘ এক দশক পর, ২০২৪ সালের আগস্টে পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সব ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে দেশে ফিরলে মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। মানুষের সেই আবেগই বুঝিয়ে দিয়েছিল, দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি।
ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও তিনি কারাভোগ করেছেন, তবুও দলের প্রতি আনুগত্যে তিনি ছিলেন অবিচল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক, যুগ্ম মহাসচিব এবং পরবর্তীতে স্থায়ী কমিটির সদস্য- প্রতিটি ধাপ তিনি অতিক্রম করেছেন যোগ্যতার সাথে।
কক্সবাজারের এই কৃতি সন্তানকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে পেয়ে নিজেদেরকে উৎফুল্ল ও নির্ভার মনে করছেন জেলার অন্য তিনটি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যরা। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে কক্সবাজার-২ আসনে বিএনপি থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, "আমাদের প্রিয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ কেবল চকরিয়া বা পেকুয়ার নন, তিনি পুরো কক্সবাজারের রাজনৈতিক অভিভাবক। তাঁর হাত ধরে কক্সবাজারবাসী ইতিহাসের প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী পেল- এটা আমাদের দ্বীপবাসীর জন্য পরম সৌভাগ্যের ও গর্বের বিষয়। মহেশখালী-কুতুবদিয়ার মতো উপকূলীয় জনপদ এতদিন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সরাসরি ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান আমাদের সেই দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন, তাই আমরা আশা করছি উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যা- বিশেষ করে সাগরপথে দস্যুতা নির্মূল এবং দ্বীপ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে এবার বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। তাঁর সুদৃঢ় নেতৃত্বে আমরা মহেশখালী ও কুতুবদিয়াকে একটি নিরাপদ এবং উন্নত জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব।"
কক্সবাজার-৩ আসনে বিএনপি থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য লুতফর রহমান কাজল বলেছেন, "কক্সবাজার সদর, রামু ও ঈদগাঁও- এই জনপদই হচ্ছে দেশের পর্যটন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সালাহউদ্দিন আহমদ ভাইকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমান প্রমাণ করেছেন, তিনি কক্সবাজারকে কতটা গুরুত্ব দেন। পর্যটন নগরী হিসেবে কক্সবাজারের বিকাশে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল মাদক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। যেহেতু তিনি অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমাদের এই জেলারই সন্তান, তাই আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- সদর ও পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আন্তর্জাতিক মানের হবে। পর্যটকরা নির্ভয়ে আসবেন, আর মাদকের ট্রানজিট হিসেবে কক্সবাজারের যে বদনাম ছিল, তা সালাহউদ্দিন ভাইয়ের কঠোর হস্তক্ষেপে চিরতরে ঘুচে যাবে। তাঁর এই মন্ত্রীত্ব আমাদের সদর-রামুর উন্নয়নের চাকাকে আরও গতিশীল করবে। একই সাথে মাদক, দখল ও জলদস্যুতা নিরসনে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে জেলার আইনশৃঙ্খলায় আমূল পরিবর্তন হবে।"
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, “উখিয়া-টেকনাফ হচ্ছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী জনপদ। এখানে রোহিঙ্গা সংকট আর মাদক চোরাচালান আমাদের দীর্ঘদিনের জাতীয় মাথাব্যথার কারণ। সালাহউদ্দিন আহমদ ভাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় আমরা সীমান্তবাসী সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাচ্ছি। কারণ, তিনি এই মাটিরই সন্তান, তিনি টেকনাফের নাফ নদ থেকে উখিয়ার পাহাড়- প্রতিটি সীমান্তের নাড়িনক্ষত্র চেনেন। তাঁর পক্ষে এখানকার ভূ-রাজনীতি বোঝাটাও সহজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদক নির্মূলকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি, সালাহউদ্দিন আহমদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এবার সত্যিকার অর্থেই মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত এক নিরাপদ উখিয়া-টেকনাফ গড়ে উঠবে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নতুন গতি পাবে।”
জেলাবাসী মনে করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এখন তাঁর কাঁধে বিশাল দায়িত্ব। একদিকে দেশের ভেঙে পড়া পুলিশি ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পুনর্গঠন, অন্যদিকে কক্সবাজারকে একটি পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সমন্বয়- এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। সালাহউদ্দিন আহমদের হাত ধরে সাগরপাড়ের রাজনীতিতে যে নতুন সূর্যোদয় হলো, তা জাতীয় রাজনীতিতেও এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।