আল্লাহ সকলকে তার নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যু দান করেন। তাঁর হুকুম ব্যতীত কেউই মৃতুবরণ করতে পারে না (আল-কোরআন)। মানুষের মৃত্যু না হলে বেঁচে থাকার কোন মর্যাদাই থাকত না। পবিত্র আল-হাদিসে উল্লেখ আছে, পার্থিব সুখ বিনাশকারী মৃত্যুর কথা সর্বদা স্মরণ করিও। মৃত্যু মুসলমানদের নিকট উপঢৌকন স্বরূপ- মৃত ব্যক্তিদেরকে সর্বদা স্মরণ করিও, তাদের গুণকীর্তন করিও এবং তাদের সম্পর্কে মন্দ বাক্য বলিও না। জীব মাত্রই একদিন মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহন করবে। সে ধীর গতিতে আসুক বা দ্রুত গতিতে আসুক, অবশেষে সে চির সত্য মৃত্যু একদিন আসবেই।
বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে দেশজুড়ে যে গভীর শোক ও অভূতপুর্ব আবেগ প্রকাশ পাচ্ছে তা মানুষ আগে কোন দিন দেখেন নাই। তাঁর ঐতিহাসিক জানাজায় কত লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল তা বলা কঠিন। অনেকে বলছেন কোটি হবে, আবার অনেকে বলছেন কোটির কম হবে। তবে ঢাকা মহানগরীজুড়েই জানাজা হয়েছে। সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেনের মত অতি বৃদ্ধ জাতীয় নেতা যেমন হুইল চেয়ারে বসে গিয়েছেন, অনেক শিশুও পিতার হাত ধরে,কাঁধে চড়ে জানাজায় শরীক হয়েছিলেন। যেন শুধু তারেক রহমানের মা নয়, দেশবাসীর মা ইন্তেকাল করেছেন। সবার চোখে পানি। আল্লাহর হুকুম ছাড়া মৃত্যু হয় না তা সকল মুসলমান বিশ্বাস করলেও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর জন্য বিগত সরকারের অহংকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছেন। বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল ইসলাম খান জানাজার আগে সেই কথা বলার পর সাধারণ মানুষ তা আরো বেশী বিশ্বাস করছেন। শেখ হাসিনার বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্ল করে প্রদত্ত ডাহা মিথ্যা ও অশোভন মন্তব্যগুলো ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন আবার ভেসে বেড়াচ্ছে। দেশের সর্বস্থরের মানুষ তা শুনছেন আর খালেদা জিয়ার প্রতি অধিক সহানুভুতিশীল হয়ে তাঁকে দোয়া করছেন, তাঁর জন্য চোখের পানি ফেলছেন। তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাঁর কবর জেয়ারত করতে যাওয়া দেশের সর্বস্থরের নারী, পুরুষ, শিশুদের ঢল প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। তাদের হাতে ফুলের তোড়া, চোখে পানি দেখা যায়।
তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বনেতারা। তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ও জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের স্পীকার সরদার আয়াজ সাদিক। উপস্থিত ছিলেন ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মালদ্বীপের একজন মন্ত্রী। গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে রাখা শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন চীন, ভারত, পাকিস্তান ,নেদারল্যান্ডস ,সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ঢাকাস্থ জাতিসংঘ অফিস ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস শোক প্রকাশ করেছে। মুসলিম বিশ্বের নেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন। সকল নির্বাচনে তিনি একজন অপরাজিত নেত্রী ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এখন তিনি বা তাঁর দল ক্ষমতায় নাই। তাঁকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। রাষ্ট্রের পক্ষে এক দিন বন্ধ ও তিন দিনের শোক পালনের ঘোষণা করা হয়েছিল।
রাজনৈতিকভাবে বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কমাতে না পেরে তাঁকে ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রের বিচারবিভাগ থেকে শুরু করে সকল বিভাগ ও প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করেছেন পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁকে জনসমক্ষে হেয়প্রতিপন্ন ও আশ্রয়হীন করার জন্য। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমল থেকে প্রায় চল্লিশ বছরের স্মৃতিবিজরিত বাড়ী থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানার (জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট) ফান্ডের দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দুর্নীতির মামলায় শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিচার শেষ হওয়ার সময় ব্যাংক হিসাবে সেই দুই কোটি টাকা সুদে-আসলে বেড়ে আট কোটি টাকা হয়েছে। এতিমের টাকা আত্মসাৎ করা হল কোথায়? অভিযোগ সত্য ও আ্ইনানুগ এবং বিচার যথাযথ হলে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর উচ্চ আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস দিতেন না। প্রায় পরিত্যক্ত পুরাতন কারাগারে প্রায় চিকিৎসাবিহীন রেখে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিদেশে স্বাধীনভাবে চিকিৎসা করার অনুমতি দেওয়া হয় নাই। ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার প্রভিশোর বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডে দন্ডনীয় গুরুতর অপরাধের আসামী হলেও মহিলা বিবেচনায় বা অক্ষম বিবেচনায় জামিন দেওয়ার বিধান ছিল, এখনও আছে। বেগম খালেদা জিয়া স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারতেন না বিধায় তাঁকে সেবা করার জন্য কাজের মেয়ে ফাতেমাকে জেলের ভিতর থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ দেশের নাগরিক ফাতেমা কোন অপরাধ না করা সত্ত্বেও তাকেও নজিরবিহীনভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কারাভোগ করতে হয়েছিল। তাই কাজের মেয়ে মহাত্মা ফাতেমাকে তারেক রহমান এখন নিজের বোন ও জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার কন্যা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে আইনানুগভাবে প্রাপ্য অধিকার থেকে পলাতক হাসিনা সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করেছিলেন। এত নির্যাতনের পরও শেখ হাসিনা ও সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতিরা পালিয়ে গেলেও ৫ আগস্টের পর নির্যাতনকারী শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের কটাক্ষ করেন নাই। তিনি প্রতিহিংসামূলক একটি শব্দও উচ্চারণ না করে বিজয়ী দেশবাসীকে শান্তি ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার একটি স্বতন্ত্র অবদান রয়েছে। অসংখ্য কষ্ট,উসকানি ও চরম চাপের মধ্যেও তিনি সাধারণত স্বল্পভাষী ছিলেন। কটুক্তি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে নিজেকে সচেতনভাবে দূরে রেখেছেন, যা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরল। এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শিক্ষনীয়। ইজ্জতের মালিক আল্লাহ। মানী ব্যক্তিকে আল্লাহ ইজ্জত দেন। বেগম খালেদা জিয়া তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর খুব খারাপ সময়ে ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে ৭১৮ পৃষ্টার ইংরেজী ভাষায় সাহসী মাহফুজ উল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্যবহুল বই রচনা করেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাষ্ট মামলায় কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জবানবন্দি দেওয়ার সময় বেগম খালেদা জিয়া তার নিজের আত্মপক্ষ সমর্থন করে সম্পূর্ণ সত্য একটি লিখিত জবানবন্দি দাখিল করেছিলেন। ’বিএনপি ডানপন্থীদের বামে বামপন্থীদের ডানে’ শিরোনামে স্বনামে পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছিলেন। শেখ হাসিনা বার বার অভিযোগ করতেন বেগম খালেদা জিয়া বিদেশী রাষ্ট্র ও আর্ন্তজাতিক সাহায্য সংস্থার কাছে বাংলাদেশ সরকারকে দান, অনুদান,ঋণ না দেওয়ার অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছিলেন। এখন বাংলাদেশের প্রতি নাগরিকের কাঁধের উপর প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা ঋণের বোঝা। বিদেশী ঋণের বেশীর ভাগ টাকাসহ ব্যাংকে জনগণের সঞ্চিত, রক্ষিত লাখ লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে নিয়ে গিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার লেখা সেই জাতীয় গুরুত্বসম্পর্ন চিঠি,লিখিত বক্তব্য,কলামগুলো বই আকারে প্রকাশ করার জন্য তারেক রহমানের কাছে দাবী করছেন আমজনতা। তাঁর জীবনীগ্রন্থ ও লেখাগুলো ভবিষ্যতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।