শীত মৌসুম এলেই বাংলার প্রতিটি ঘরে খাদ্য-তালিকায় গুড়ের কদর বেড়ে যায়। এই সময়টায় হাটবাজার থেকে শুরু করে অলিগলি সবখানেই গুড়ের রমরমা বেচাকেনা শুরু হয়। কারণ, পিঠা-পুলি, পায়েস থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিষ্টান্ন সবেতেই অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে গুড়। ব্যাপক চাহিদা সামনে রেখে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই সময়টায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি পরিমাণে ভেজাল গুড় উৎপাদন করে। এই সময়টায় কেবল খেজুরের গুড়েই নয়, প্রাকৃতিক আখের গুড়ের নামে রাসায়নিক মেশানো, রঙ ও সুগন্ধি যোগ করা নিম্নমানের পণ্য নির্বিঘ্নে বিক্রি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই চিনি গলিয়েই গুড় তৈরি করা হয়। বড় হাঁড়ি বা ড্রামে চিনি ও পানি জ্বাল দিয়ে ঘন করা হয়, এরপর সেটিকে গুড়ের মতো আকার দেওয়া হয়। এতে খেজুরের কোনো রস না থাকলেও বাইরে থেকে দেখতে গুড়ের মতো হওয়ায় সাধারণ ভোক্তা সহজে বুঝতে পারেন না। গুড়ের রঙ ও আকর্ষণ বাড়াতে বিভিন্ন রাসায়নিক ও কৃত্রিম রঙ ব্যবহার করা হয়। পোড়া তেল, কেমিক্যাল রঙ বা কখনও কখনও ফিটকিরি, বেকিং সোডা ও হাইড্রোজ (সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট) ব্যবহার করে গুড়কে উজ্জ্বল বা হালকা রঙের করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেজাল গুড় দীর্ঘমেয়াদে মানুষের যকৃৎকে দুর্বল করে এবং পেটের আলসার ও গ্যাস্ট্রিকের ঝুঁকি বাড়ায়। আর সাধারণ মানুষ শুধু রঙ-চকচকে দেখে গুড় কিনে প্রতিদিন অজান্তেই বিষ খাচ্ছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে সাত হাজার কেজির বেশি ভেজাল গুড় জব্দ করা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় হয়েছে অন্তত ১১ লাখ টাকা। চলতি মাসে ঢাকার ধামরাইয়ে ভেজাল গুড় উৎপাদনকারী একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এমন কর্মকাণ্ড সারা বাংলাদেশেই করে যাচ্ছে। ক্যাব-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শীতকালে গুড়ের চাহিদা বাড়লেই একশ্রেণির ব্যবসায়ী মৌসুমি লাভের আশায় গুড়ের বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে ভেজাল গুড় উৎপাদন ও বিক্রি বাড়িয়ে দেয়। বাজার তদারকিতে শৈথিল্যে ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নজরদারির অভাবে ভেজালকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
খাদ্য নিরাপত্তা আইন-২০১৩ অনুযায়ী ভেজাল বা ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা নিষিদ্ধ। এ আইনে দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মাঝেমধ্যে অভিযানের কথা শোনা গেলেও রহস্যজনক কারণে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ভেজাল গুড় বিস্তারের আরেকটি কারণ হলো খাঁটি গুড় উৎপাদনের খরচ ও সময়। আখের রস জ্বাল দিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গুড় বানাতে জ্বালানি, শ্রম ও দক্ষতা লাগে। কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে কম সময়ে বেশি লাভ করা যায়- ব্যবসায়ীদের এই লোভই ভেজালকে উৎসাহিত করছে। এর ফলে খাঁটি গুড়ের উৎপাদকরাও বাজারে টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন। তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। আমরা মনে করি, খাঁটি উৎপাদকদের উৎসাহ দিতে ন্যায্য দাম, সহজ ঋণ ও বিপণন সহায়তা প্রয়োজন।
আমরা আরও মনে করি, ভেজালবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হোক। জেলা-উপজেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইকে সমন্বিত উদ্যোগে খেজুর ও আখের গুড়ের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। খাঁটি গুড় উৎপাদকদের নিবন্ধন ও মান নির্ধারণ করে বাজারে ‘সার্টিফায়েড’ লেবেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ভোক্তা বুঝতে পারবে কোনটি নিরাপদ। ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের বিশ্বাস, কয়েকটি বড় অভিযানে অভিযুক্তদের কঠোর দণ্ড হলে বাজারে অভিযানের সুফল দৃশ্যমান হবে।
ভেজাল রোধে ভোক্তাদের আরও সচেতন হতে হবে। খুব চকচকে, অতিরিক্ত লাল বা কালচে গুড় এড়ানো উচিত। খাঁটি গুড় সাধারণত তুলনামূলক কম রঙিন, স্বাদে স্বাভাবিক এবং পানিতে দিলে সহজে গলে না। পাশাপাশি বিশ্বস্ত উৎপাদক ও স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে গুড় কেনার প্রবণতা বাড়ালে বাজারে ভেজালের চাপ কমবে।
গুড় আমাদের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে ভেজাল গুড়ের নীরব হুমকি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। তাই এখনই লাগাম টানা দরকার। ভেজাল গুড়ের সয়লাব শুধু খাদ্য প্রতারণা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব এক ঘাতক। আমাদের বিশ্বাস, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, উৎপাদকের নৈতিকতা এবং ভোক্তার সচেতনতাই পারে এই ভেজালের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।