মিয়ানমারে রোববার যে সাধারণ নির্বাচন শুরু হচ্ছে, সেটিকে ‘প্রহসন’ হিসেবেই দেখছে দেশটির বিরোধী শিবির ও পশ্চিমা বিশ্ব।
বিবিসি লিখেছে, একদিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বহু নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে; অন্যদিকে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের প্রায় অর্ধেক মানুষই ভোট দিতে পারবে না।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের প্রায় পাঁচ বছর পর সামরিক সরকার ধাপে ধাপে এ নির্বাচন করছে। ওই অভ্যুত্থানের কারণে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তা গৃহযুদ্ধের রূপ পায়।
পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর পথ খোঁজা চীনের সমর্থনপুষ্ট জান্তা সরকার নিজেদের বৈধতা তৈরি করে ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করতে চাইছে।
ভোটে বাধা দেওয়া বা বিরোধিতা করার অভিযোগে নতুন একটি আইনের আওতায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই আইনে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
এই আইনে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চলচ্চিত্র পরিচালক মাইক টি, অভিনেতা কিয়াও উইন হ্টাট এবং কৌতুক অভিনেতা ওন ডেইং। জুলাই মাসে প্রণীত এ আইনের আওতায় তাদের সাত বছর করে কারাদণ্ড হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ভোটের প্রচারমূলক একটি চলচ্চিত্রের সমালোচনা করেছিলেন তারা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ফোলকার তুর্ক বলেন, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠিত হওয়া বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার দেখানোর কোনো পরিবেশ নেই।”
তুর্ক মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সাধারণ মানুষ সব দিক থেকেই ‘চাপের মধ্যে’ রয়েছে।
ভোট বর্জনের জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো লোকজনকে হুমকি দিচ্ছে বলেও তিনি তথ্য দেন।
বিবিসি লিখেছে, অভ্যুত্থানবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠী এবং জাতিভিত্তিক সশস্ত্র বাহিনী—উভয়ের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী একাধিক ফ্রন্টে লড়াই করছে। বড় ধরনের একাধিক ধাক্কায় তারা দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারালেও চীন ও রাশিয়ার সহায়তায় চালানো অবিরাম বিমান হামলার ফলে এ বছর কিছু এলাকা আবার দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে।
এ গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ, ধ্বংস হয়েছে অর্থনীতি এবং মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গেল মার্চে হওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্প এবং আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সবমিলিয়ে দেশটির বৃহৎ অংশ এখনো বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফলে নির্বাচন আয়োজনে বড় ধরনের অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
আগামী মাসের মধ্যে ৩৩০টি প্রশাসনিক অঞ্চলের (টাউনশিপ) মাধ্যমে ২৭৪টিতে ভোটগ্রহণ করা হবে তিন ধাপে। বাকি এলাকাগুলোতে অস্থিরতা চরম পর্যায়ে রয়েছে। জানুয়ারির শেষ দিকে ভোটের ফল ঘোষণা করা হতে পারে।
বিবিসি লিখেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকায় কোনো ভোটগ্রহণ হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি যেসব টাউনশিপে ভোট হচ্ছে, সেখানেও সব আসনে ভোট হবে না; ফলে ভোটার উপস্থিতি অনুমান করা কঠিন।
সামরিক বাহিনী-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিসহ ছয়টি দল সারা দেশে প্রার্থী দিচ্ছে। এ ছাড়া আরও ৫১টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কেবল রাজ্য বা আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিসহ প্রায় ৪০টি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দলটি ২০১৫ ও ২০২০ সালে বিপুল জয় পেয়েছিল। সু চি ও দলের বহু শীর্ষ নেতাকে কারাবন্দি করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। দলটির অনেক নেতা নির্বাসনেও রয়েছেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী স্প্রিং স্প্রাউটসের মুখপাত্র হটিন কিও অ্যা বার্তা সংস্থা মিয়ানমার নাওকে বলেন, প্রথম ধাপের ফল তাদের পক্ষে না গেলে কর্তৃপক্ষ পরের ধাপে কৌশল বদলাতে পারে।
পশ্চিমাঞ্চলীয় চিন রাজ্যের বাসিন্দা রাল উক থাং মনে করেন, সাধারণ মানুষ এ নির্বাচন চায় না।
অশীতিপর এ ব্যক্তি বলেন, “সামরিক বাহিনী জানে না আমাদের দেশ কীভাবে শাসন করতে হয়। তারা কেবল নিজেদের উচ্চপদস্থ নেতাদের স্বার্থে কাজ করে।
“যখন ডাও অং সান সু চির দল ক্ষমতায় ছিল, তখন আমরা সামান্য হলেও গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমরা শুধু কাঁদি আর চোখের জল ফেলি।”
ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব এ নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বর্ণনা করে প্রত্যাখান করেছে। আঞ্চলিক জোট আসিয়ান যে কোনো নির্বাচন আয়োজনের আগে রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে।
ভোট নিয়ে সবধরনের সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমারের জান্তা বলছে, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশকে ফেরাতে তারা কাজ করছে।
জান্তার মুখপাত্র জাও মিন টান গত সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “এই নির্বাচন মিয়ানমারের জন্য। এটি মিয়ানমারের জনগণের জন্য। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নয়।”
এর আগে এ সপ্তাহেই জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সতর্ক করে বলেন, যারা ভোট দিতে অস্বীকার করবে তারা গণতন্ত্রের দিকে অগ্রযাত্রাকে প্রত্যাখ্যান করছে।