দিন দিন আমরা সেন্টমার্টিনকে হারাচ্ছি। এই হারিয়ে যাওয়া সেন্টমার্টিনকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। তাই যেভাবেই হোক- সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য সেন্টমার্টিনের পরিবেশ জীববৈচিত্র, জলজ জীব, অনুজ জীবগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে। দ্বীপকে বাঁচিয়ে সবকিছু করতে হবে। যদি দ্বীপই হারিয়ে যায় পর্যটন বা স্থানীয় জনগোষ্ঠী কোথায় যাবে। তাই যেকোনোভাবে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ-প্রতিবেশকে রক্ষা করতে হবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে কক্সবাজারে শহরের হোটেল রামাদার হলরুমে অনুষ্ঠিত ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন’ শীর্ষক প্রকল্পের ইনসেপশন ওয়ার্কশপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ ।
সচিব বলেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে সরকারের সব কার্যক্রম গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগৃহীত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, অতীতে দ্বীপটিতে কী ছিল এবং বর্তমানে কী রয়েছে-সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুস্পষ্ট ধারণা আছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান এনডিসি’র সভাপতিত্বে আয়োজিত কর্মশালায় ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম থেকে সরে না এলে আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।’
মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশিক্ষিত করে দ্বীপ রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতেই তুলে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবদুল লতিফ জনির সঞ্চালনায় কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক জমির উদ্দিন।
প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুল হাসান জানান, ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন’ প্ কল্পটি তিন বছর মেয়াদি।
৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের আওতায়-পর্যটক নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সুরক্ষা, কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি, কেয়াবন সৃষ্টি, দ্বীপের অতিদরিদ্র ৫০০ পরিবারকে মাসিক ৫ হাজার ৭০০ টাকা করে অনুদান দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী মো. ওয়ালি উল হক বলেন, ‘এই প্রকল্পের সব অর্থই সরকারি তহবিল থেকে দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৭ লাখ টাকা স্থানীয় জনগণকে প্রদান করা হয়েছে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেন্টমার্টিনকে আমাদের বাঁচাতেই হবে।’
কর্মশালায় জানানো হয়, অসাধারণ পরিবেশগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সেন্টমার্টিন দ্বীপ বর্তমানে- প্রবাল ও ঝিনুক আহরণ , টেকসই নয় এমন মৎস্য আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি এর ফলে গুরুতর পরিবেশগত অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে।
সরকারের প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন, টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক যৌথ ব্যবস্থাপনাকে একত্রিত করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দ্বীপটির দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্য ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করা।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে পর্যটকদের সচেতন করতে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রচারণায় ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা জরুরি।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশ আইন প্রয়োগে ট্যুরিস্ট পুলিশকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘এনভায়রনমেন্টাল পুলিশ’ গঠন করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘এখানে দখলদার ও আধিপত্যবাদীরা সক্রিয়। আমাদের আইন দেওয়া হলে আমরা দূষণকারীদের শক্তভাবে মোকাবেলা করব। তবে শুধু আইন দিয়ে নয়, জনগণকেও সচেতন হতে হবে।’
বন্যপ্রাণী গবেষক ড. রেজা খান বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকে প্রথম সেন্টমার্টিনে বন উজাড় শুরু হয়। তবে রাহা বনে এখনও বিরল প্রজাতির প্রজাপতি, ১০-১৫ প্রজাতির ব্যাঙ এবং ১০০-১৫০ প্রজাতির পাখি ও বাদুড় দেখা যায়।’
তিনি ছেঁড়াদিয়ায় প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনায়ন সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘এখানে কোনোভাবেই কৃত্রিমভাবে গাছ লাগানো যাবে না। বন নিজে নিজেই তৈরি হতে দিতে হবে।’
উন্মুক্ত আলোচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতি বছর সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি বাড়ছে। মাছ ধরা কমে যাচ্ছে। জেলেরা সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকেন। তাই চলমান প্রকল্পগুলোতে জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা রাখা জরুরি।’
নেকমের আবদুল কাইয়ুম বলেন, গত তিন-চার বছর ধরে সেন্টমার্টিনে সবুজ কচ্ছপ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী বিরল এই প্রজাতিটি বিলুপ্তির পথে।’
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি হাবিব খান বলেন,‘দ্বীপের হোটেল-মোটেল মালিকদের ৯০ শতাংশই বহিরাগত। তারা সাগরের পাশে অবকাঠামো নির্মাণ করে স্থানীয়দের ক্ষতি করছেন।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত সরকারি দপ্তরগুলো ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ দেয়নি। ফলে পর্যটকরাই শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সেন্টমার্টিন দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকা সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।