অসীম নীল জলরাশি, প্রখর রোদ, আর জলদস্যুদের নির্মম লুটপাটের পর কাঁচা মাছ ও বড়শির টোপ খেয়ে সাগরে টিকে থাকার ৩৬ দিনের লড়াই। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মহেশখালীতে উদ্ধার হওয়া সেই দুই শ্রীলঙ্কান জেলের পাশে এবার মানবিকতার হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশের প্রশাসন। অবৈধ অনুপ্রবেশের চিরাচরিত আইনি কঠোরতা থেকে সরে এসে, সার্বিক মানবিক বিবেচনায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করেনি পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে (সেফ কাস্টডি) রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) ভোরে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করে মহেশখালী উপকূলে নিয়ে আসেন কুতুবজুমের সাহসী বোট মালিক জিয়াউর রহমান ও তাঁর সঙ্গীরা। নিশ্চিত তথ্যে জানা গেছে যে, উদ্ধার হওয়া ওই দুই জেলে সম্পর্কে বাবা-ছেলে। বাবার নাম সাউন্ডা হান্নাদিগে পিয়াসেনা (৭৫) এবং ছেলের নাম সাউন্ডা হান্নাদিগে চামিন্দা (৫১)। তাঁদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার মাতারা জেলার গান্ধারা থানার দেবিনুওয়ারা এলাকায়। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের জলসীমায় পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া প্রবেশের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও, ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশনায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে প্রশাসন।
মহেশখালী থানার জিডির প্রেক্ষিতে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান হোসেনের আদালত তাদের সেফ কাস্টডিতে রাখার এই আদেশ দেন। মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান জানান, "সার্বিক মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের বিষয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত মামলা দেওয়া হয়নি। আমরা তাদের সেফ কাস্টডির (নিরাপদ হেফাজত) আবেদন করে আদালতে উপস্থাপন করেছিলাম। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে, দূতাবাস ও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শেষে তারা নিজ দেশে ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।"
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে আগামী ৭ দিনের মধ্যে তাদের দেশে ফেরতের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ২৫ জুলাই দুপুরে কুতুবজুমের বটতলী গ্রামে জেলে জিয়াউরের বাড়ি থেকে তাদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয় এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করানো হয়। রবিবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শ্রীলঙ্কান দুই জেলে থানা হেফাজতেই আছেন এবং সমাজসেবা অফিসে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কান বোটটিও পুলিশ হেফাজতে আনা হয়েছে বলে জানান ওসি।
মহেশখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা দিদার আলম জানান, তাঁরা আদালতের আদেশ পেয়েছেন। তবে উদ্ধারকৃত এই ভিনদেশি নাগরিকদের নিরাপদ হেফাজতে রাখার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা মহেশখালীতে না থাকায়, তাঁদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ইউনিট বা ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, তাঁদের নিরাপদ হেফাজতে পাঠাতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
সাগরে মৃত্যুর প্রহর গোনা বিদেশিদের যিনি উদ্ধার করেছেন, মহেশখালীর সেই বোট মালিকের নাম জিয়াউর রহমান। তাঁর ফিশিং ট্রলারটির নাম ‘এফবি মা-বাবার দোয়া’। এই ট্রলারে জিয়াউর রহমানসহ মোট ৯ জন মাঝিমাল্লা ছিলেন, যাদের সম্মিলিত সাহসিকতায় রক্ষা পেয়েছে দুটি প্রাণ।
উদ্ধারকারী ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমান জানান, ১৩ জুলাই প্রায় ৩ লাখ টাকার বাজার করে তারা মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে মাছ ধরতে যান। সমুদ্রের ৮ বিয়ো (গুলিরদ্বার) পয়েন্ট অতিক্রম করার পর ভাসতে থাকা একটি ছোট বোট থেকে জেলেরা তাদের ডাকতে থাকেন। কাছে যাওয়ার পর ভিনদেশি এক জেলে বোটে উঠে তাঁর পায়ে পড়ে বাঁচানোর আকুতি জানান। জিয়াউর রহমান বিস্ময়ের সাথে জানান, দীর্ঘ ৩৬ দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় জীবন বাঁচাতে ওই শ্রীলঙ্কান জেলেরা কেবল সাগরের কাঁচা মাছ ও বড়শির টোপ খেয়ে কোনোমতে প্রাণ টিকিয়ে রেখেছিলেন। একপর্যায়ে বিদেশি ওই ফাইবার বডির ২২ ঘোড়া ইঞ্জিনচালিত বোটটিকে (যার গায়ে ইংরেজিতে লেখা 'IDAY-A-0122KMN') ‘এফবি মা-বাবার দোয়া’ ট্রলারের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে টেনে মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাটে নিয়ে আসেন তাঁরা।
বিপন্ন মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের চরম ক্ষতির কথাও আক্ষেপ করে জানান জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, "এই ট্রিপে আমাদের আর মাছ ধরা হলো না। ফেরার সময় সাগর উত্তাল থাকায় আমার নিজের বোটটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।" একজন দরিদ্র জেলে হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
উদ্ধার হওয়া স্কিপার লাইসেন্স থেকে জানা যায়, চামিন্দা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর দেবিনুওয়ারার রুরাল হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা। সিংহলী ভাষায় চামিন্দার বক্তব্য থেকে জানা যায়, গত ১৯ জুন দুপুর ২টার দিকে তারা শ্রীলঙ্কার ডোন্ডা বন্দর থেকে মাছ ধরতে সাগরে নামেন। পরদিন ভোরে তাদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফিশিং বোটটি সাগরের তীব্র জলস্রোতে ভাসতে ভাসতে বাংলাদেশ জলসীমায় চলে আসে। সাগরে ভাসমান অবস্থায় তিন দিন আগে তারা একটি ট্রলারের দেখা পেয়ে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ধারের বদলে সেই বোটের আরোহী জলদস্যুরা তাঁদের ওপর হামলা চালায় এবং বোটে থাকা ব্যাটারি, মোটরসহ সমস্ত মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।
লুটপাটের শিকার হয়ে আরও দুই দিন সাগরে ভাসার পর গত ২৪ জুলাই ভোরে মহেশখালীর জিয়াউর রহমানের ফিশিং বোটটি তাঁদের দেখতে পায়। উদ্ধার পাওয়ার পর আবেগপ্লুত চামিন্দা বলেন, "আমাদের কাছে কোনো খাবার ছিল না। এই মানুষগুলো আমাদের দুটি বিস্কুটের প্যাকেট দেয়। তা খাওয়ার পর আমরা একটু শক্তি পেয়ে চাল চাইলাম, কারণ পেটে খুব ক্ষুধা ছিল। তাঁরা আমাদের এক পাতিল রান্না করা ভাত খেতে দেন।"
তিনি আরও বলেন, "তাঁরা প্রথমে আমাদের খাবার দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারে বোট ঘুরিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে এবং রশি বেঁধে টেনে উপকূলের ঘাটে নিয়ে আসে। ঘাটে আনার পর তারা আমাদের যে ভালোবাসা ও খাবার দিয়েছে, মনে হচ্ছিল ঈশ্বর যেন আমার নিজের মায়ের রূপ ধরে আমাদের বাঁচাতে এসেছেন।"
সাগরের বুকে জলদস্যুতার বর্বরতাকে হার মানিয়ে মহেশখালীর জেলের অসামান্য মানবিকতা এবং প্রশাসনের সহানুভূতিশীল আচরণ এখন সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। প্রসঙ্গত, মহেশখালীতে শ্রীলঙ্কার জেলে উদ্ধারের ঘটনাটি দেশজুড়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং শ্রীলঙ্কার গণমাধ্যমেও খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পেয়েছে।