অসীম নীল জলরাশি, মাথার ওপর প্রখর রোদ আর চারপাশে মৃত্যুভয়। নেই খাবার, নেই এক ফোঁটা পানীয় জল। ইঞ্জিন বিকল হয়ে টানা এক মাসের বেশি সময় সাগরে ভাসতে ভাসতে বাঁচার শেষ আশাটুকুও যখন নিভে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ‘মায়ের রূপে’ হাজির হলেন বাংলাদেশের এক জেলে।
বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থা থেকে মহেশখালীর কুতুবজুমের সাহসী বোট চালক ও মালিক জিয়াউর রহমানের হাতে উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলঙ্কান জেলের অভিজ্ঞতা এটি। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা এসব মানুষের গল্প কেবল প্রকৃতির নির্মমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেখানে জড়িয়ে ছিল সাগরে জলদস্যুতার বীভৎসতা এবং পরিশেষে এক বাংলাদেশির মানবতাবোধের অনন্য নজির।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) ভোরে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থা থেকে তাদের উদ্ধার করে মহেশখালী উপকূলে নিয়ে আসেন জিয়াউর রহমান।
# সেই অভিশপ্ত যাত্রা ও পরিচয়:
মহেশখালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলঙ্কান জেলের নাম- এস. এইচ. চামিন্দা (৫১) এবং সাউন্ডা হান্নাদিগিপোয়াতং (৩০)। তারা বাবা-ছেলে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া স্কিপার লাইসেন্স থেকে জানা যায়, চামিন্দা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর দেবিনুওয়ারার রুরাল হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা।
সিংহলী ভাষায় চামিন্দার বক্তব্য থেকে জানা যায়, গত ১৯ জুন দুপুর ২টার দিকে তারা শ্রীলঙ্কার ডোন্ডা বন্দর থেকে মাছ ধরার উদ্দেশ্যে গভীর সাগরে পাড়ি জমান। কিন্তু সাগরে পৌঁছানোর পরদিন ভোরে তাদের ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফিশিং বোটটি সাগরের তীব্র জলস্রোতে ভাসতে ভাসতে শ্রীলঙ্কার জলসীমা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ জলসীমায় চলে আসে।
# লুটপাট ও দস্যুতার নির্মমতা:
দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় সাগরে ভেসে থাকার সময় জীবনের চরম নির্মমতার মুখোমুখি হন তাঁরা। চামিন্দা জানান, সাগরে ভাসমান অবস্থায় তিন দিন আগে তারা একটি ট্রলারের দেখা পেয়ে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্ধারের বদলে সেই বোটের আরোহী জলদস্যুরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। বোটে থাকা ব্যাটারি, মোটরসহ সমস্ত মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। সাগরের বুকে অসহায় দুটি মানুষের ওপর এমন অমানবিক আচরণ তাঁদের বাঁচার আশা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল।
# ‘ঈশ্বর যেন মায়ের রূপে এলেন’:
লুটপাটের শিকার হয়ে আরও দুই দিন সাগরে ভাসার পর গত ২৪ জুলাই ভোরে মহেশখালীর জিয়াউর রহমানের ফিশিং বোটটি তাঁদের দেখতে পায়।
উদ্ধার পাওয়ার পর আবেগপ্লুত চামিন্দা বলেন, "আমাদের কাছে কোনো খাবার ছিল না। এই মানুষগুলো আমাদের দুটি বিস্কুটের প্যাকেট দেয়। তা খাওয়ার পর আমরা একটু শক্তি পেয়ে চাল চাইলাম, কারণ পেটে খুব ক্ষুধা ছিল। তাঁরা আমাদের এক পাতিল রান্না করা ভাত খেতে দেন।"
তিনি আরও বলেন, "তাঁরা প্রথমে আমাদের খাবার দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বারে বোট ঘুরিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে এবং রশি বেঁধে টেনে উপকূলের ঘাটে নিয়ে আসে। ঘাটে আনার পর তারা আমাদের যে ভালোবাসা ও খাবার দিয়েছে, মনে হচ্ছিল ঈশ্বর যেন আমার নিজের মায়ের রূপ ধরে আমাদের বাঁচাতে এসেছেন।"
# কাঁচা মাছ খেয়ে বেঁচে ছিলেন ৩৬ দিন:
উদ্ধারকারী মহেশখালীর ট্রলার মালিক ও মাঝি জিয়াউর রহমান জানান, ১৩ জুলাই প্রায় ৩ লাখ টাকার বাজার করে তিনি মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে মাছ ধরতে যান। সমুদ্রের ১৮ বিয়ো পয়েন্ট অতিক্রম করার পর ভাসতে থাকা একটি ছোট বোট থেকে জেলেরা তাঁকে ডাকতে থাকেন।
জিয়াউর রহমান বলেন, "কাছে যাওয়ার পর ওই বোট থেকে একজন জেলে আমার বোটে উঠে পায়ে পড়ে বাঁচানোর আকুতি জানায়। আমি তাদের ভাষা বুঝতে পারছিলাম না।"
জিয়াউর রহমান বিস্ময়ের সাথে জানান, দীর্ঘ এই ৩৬ দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ওই শ্রীলঙ্কান জেলেরা কেবল সাগরের কাঁচা মাছ খেয়ে কোনোমতে প্রাণ টিকিয়ে রেখেছিলেন। একপর্যায়ে বিদেশি ওই বোটটিকে নিজের ট্রলারের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে টেনে মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাটে নিয়ে আসেন তিনি। উদ্ধারকৃত বোটটি বর্তমানে ঘটিভাঙ্গা ঘাটেই নোঙর করা রয়েছে।
জিয়াউর আক্ষেপ করে জানান, এই ট্রিপে তাঁর আর মাছ ধরা হলো না। ফেরার সময় সাগর উত্তাল থাকায় তাঁর নিজের বোটটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিজে একজন দরিদ্র জেলে দাবি করে রাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।
জানা যায়, উপকূলের কাছাকাছি আসার পর জিয়াউরের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কায় পরিবারের সাথে কথা বলেন উদ্ধারকৃত জেলেরা। এরপর পরিবার থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে এবং দূতাবাস থেকে সরাসরি জেলে জিয়াউরের সাথে যোগাযোগ করা হয়। মুমূর্ষু জেলেদের কুতুবজোম ইউনিয়নের বটতলী গ্রামে জিয়াউরের বাড়িতে নিয়ে স্থানীয় চৌকিদারের সহায়তায় সেবা-শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলা হয়। পরে পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়।
# নিরাপদ আশ্রয় ও আইনি প্রক্রিয়া:
ঘটনাটি জানতে পেরে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকৃতদের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক নিরাপত্তার আওতায় এনেছে। মহেশখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "উদ্ধার হওয়া দুই বিদেশি জেলেকে বর্তমানে নিরাপদ পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিতকরণসহ পরবর্তী আইনগত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে।"
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, "বর্তমানে উদ্ধারকৃত দুই জেলে মহেশখালী থানা হেফাজতে রয়েছেন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিষয়টি যেহেতু অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা, তাই মহেশখালী থানা সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা করে তাঁদের আদালতে উপস্থাপন করবে। পরবর্তীতে দূতাবাসের মাধ্যমে দুই দেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে আলাপের পর তাঁদের ফেরতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।"
এদিকে কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ঘটনা জানার পর উদ্ধার ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা করেছে। নৌবাহিনীর গণমাধ্যম শাখার একজন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি এখনও তাদের পর্যায়ে আসেনি।
দূতাবাসের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধারকৃত বিদেশি জেলেদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। সাগরের বুকে জলদস্যুতার বর্বরতাকে হার মানিয়ে মহেশখালীর এক সাধারণ বোট মালিকের এই অসামান্য মানবিকতা এখন সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।