টানা পাঁচ দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চকরিয়ায় ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটির নিচে চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় তাদের মা গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোররাতে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মছনিয়া কাটার ডেবলতলী এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
এদিকে পাঁচদিনের ভারিবর্ষণে গ্রামীণ সড়কগুলো পানিতে ডুবে রয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ন বন্ধ রয়েছে। রেললাইনের বিভিন্ন পয়েন্টে ডুবে থাকায় রেল চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছে সরকার। এছাড়া আভ্যন্তরীন সড়ক গুলোতে যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। কোন ধরনের যান বাহন চলাচল করতে পারছে না। অফিস ও স্কুল গামী শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করতে পারছে না। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় অনেক ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। অনেকের চুলায় পানি ঢুকার কারণে রান্নাবান্না করতে পারছে না। একাধিক পরিবারকে না খেয়ে দিন পার করতে হয়েছে। এছাড়া বন্যা কবলিত এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় টিউবওয়েবল গুলো ঢুবে রয়েছে। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত পাঁচদিনের টানা চকরিয়াসহ পুরো কক্সবাজার জেলায় সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে রেকর্ড পরিমাণ ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ভোর রাতের দিকে মছনিয়া কাটা এলাকায় একটি পাহাড়ের বিশাল অংশ পাদদেশে থাকা একটি বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে। ঘটনার সময় ঘরে দুই সন্তানসহ মা ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে পাহাড়ের মাটি চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই দুই শিশু মারা যায়।
নিহতরা হলেন-চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়ন ৭নম্বর মছনিয়াকাটা ডেবলতলী এলাকার আব্দুল মজিদের ছেলে তৌওসিফ মিয়া (১৩) ও একই এলাকার মৃত মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে রুমি আক্তার (১৭)। সম্পর্কে তারা দুইজন আপন চাচাত-জেঠাত ভাইবোন। এ ঘটনায় আহত হন মৃত মোহাম্মদ কাজলের স্ত্রী নিহত রুমি আক্তারের মাতা লায়লা বেগম (৫০)।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করে।চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া উপজেলা বরইতলী ইউনিয়নের মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড় ধসে নিকট আত্মীয় সম্পর্কে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনাটি শোনার পর পরই তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য রওনা হয়েছেন।
টানা পাঁচদিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলাসহ কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। দুই উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য গত কয়েকদিন ধরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। বানের জলে ভাসছে চকরিয়া-মাতামুহুরী, বেড়িবাঁধ ভেঙে চরম দুর্ভোগে মানুষ। মহাসড়কের একাধিক স্থানে পানি বাড়তে দেখা গেছে। অতীতে এসব এলাকায় এভাবে পানি জমতে বা সড়ক প্লাবিত হতে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ আজ ভোরে ভেঙে নতুন,নতুন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করছে। ইতিপূর্বে দুই উপজেলার দুই লক্ষাদিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় অনেক গ্রামে পানি নিষ্কাশন স্থবির হয়ে পড়েছে।
বন্যার পানির তোড়ে আমন বীজতলা ও সবজি ক্ষেত ভেসে গেছে এবং শতশত চিংড়ির ঘের ও পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মৎস্য চাষিরা বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন। সুপেয় পানির সংকট এবং শুকনো খাবারের অভাবে পানিবন্দি মানুষ চরম মানবিক সংকটে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার চরম সংকটে পড়েছে। দ্রুত ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, লঘুচাপ এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় প্রবল মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) থেকে শনিবার (১১ জুলাই) পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছেন।