সাইফুল আফ্রিদি
পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে এসেছেন ঢাকার অতুল প্রসাদ। সকালটা কেটেছে সৈকতে সানন্দে। দুপুরে হোটেলে ফিরে খাওয়া-দাওয়া। বিকেলে আবার বের হওয়ার সময় পরিবারের ছোট্ট শিশু অথৈ বলে উঠল, ‘শিশুপার্কে যেতে চাই, বাবা।’ উত্তর খুঁজতে গিয়েই জানতে পারলেন, কক্সবাজার শহরে কোথাও শিশুপার্ক নেই। তাই শিশুটিকে নিয়ে সৈকতে ঘুরেই আবার হোটেলে ফিরতে হলো তাদের।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বড় মেয়ে অর্পিতারও ইচ্ছে হলো, রাতে একটু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখবে- গান, নাচ কিংবা স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনা। পরিবার খোঁজ নিয়ে দেখল, বড় বড় কয়েকটি হোটেলের নিজস্ব ইনডোরে এমন আয়োজন থাকলেও হোটেলের বাইরে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক বিনোদনের আয়োজন খুবই সীমিত। শেষ পর্যন্ত আবারও সৈকতমুখী হলো পরিবারটি। সেখানে কিটকটে বসে পথশিশুদের গান শুনেই হোটেলে ফিরলেন তারা।
অর্পিতার বাবা অতুল প্রাসাদ বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে এসে সন্তানদের ইচ্ছে পূরণ করতে না পেরে কিছুটা হতাশ হন। গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি বলেন, প্রকৃতি ছাড়া পর্যটকদের জন্য আরও অনেক কিছু থাকা দরকার। তবে পরদিন সকালে মেরিন ড্রাইভ হয়ে প্রকৃতির কাছে গিয়ে পাহাড়-সমুদ্রের ছোঁয়া পেয়ে তাদের ভালো লাগে বলে জানান।
অতুল প্রাসাদের স্ত্রী শ্রাবস্তী কর্মকার বললেন, প্রকৃতির সবই আছে কক্সবাজারে,ব্যবস্থাপনাটা ঠিক নেই শুধু।
শ্রাবস্তীর এই কথার প্রতিফলন মিলেছে কক্সবাজারে ঘুরতে আসা অন্য পর্যটকদের অভিজ্ঞতাতেও। ঢাকা, রাজশাহী ও সিলেট থেকে আসা নিমাই,রাতুল ও অর্পনের অভিজ্ঞতা হলো, সৈকত, হোটেল, রেস্তোরাঁ, বড় বড় দালান আর কিছু পরিচিত স্পট ঘিরেই মূলত সীমাবদ্ধ কক্সবাজার ভ্রমণ। ফলে পর্যটককে নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ব্যস্ত রাখার বদলে কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখনো সেই সমুদ্রসৈকতই। সমুদ্রের ঢেউ দেখেই তাদের দিন কাটছে বলে জানান তারা।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) এর আহবায়ক মিজানুর রহমান মিল্কি বলেন, পর্যটকরা এক প্রকার সমুদ্রের ঢেউ দেখেই সময় কাটায়। সেখানেও ভিক্ষুক, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ,পথশিশুর উপদ্রব বেড়েছে। নিরবে সময়ও কাটাতে পারছে না পর্যটকরা, বীচটাও আগের মতো নেই, নোংরা আবর্জনায় ভরে গেছে। গত ১৭ বছর ধরে এসব বলে আসছি কিছুই হয়নি। এখন নতুন সরকার কি ব্যবস্থা নেয় সেটাই দেখার।
সৈকতের বাইরে নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে পরদিন মহেশখালীর উদ্দেশে রওনা দেয় পরিবারটি। পাহাড়ঘেরা দ্বীপের আদিনাথ মন্দির দেখতে যাওয়ার পথেও সুখকর অভিজ্ঞতা হয়নি তাদের। কক্সবাজার বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে গিয়ে টোল ও ভাড়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন তাঁরা। ৫ টাকা ঘাট ভাড়ার বিপরীতে জনপ্রতি ৫০ টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। তাঁদের মতে, ব্যবস্থাপনা ও প্রচারণা থাকলে কক্সবাজার থেকে মহেশখালী ভ্রমণ পর্যটকদের জন্য আরও আনন্দের হতে পারত।
তবে ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ নিযুক্ত কর্মচারীরা জানালেন, স্থানীয়দের জন্য ৫ টাকা,পর্যটকদের জন্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে ঘাটে একই দেশের মানুষের জন্য দ্বৈত ভাড়ার অভিযোগও সমালোচনা করেন স্থানীয়সহ আগত আরও কয়েক পর্যটক।
তবে পর্যটনের সমস্যাগুলো শুধু বিনোদন বা ভ্রমণের সুযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পর্যটকের মৌলিক সেবা ও নিরাপত্তার প্রশ্নও রয়েছে।
# মৌলিক সেবাও নেই
অতুল প্রাসাদের পরিবার বিনোদন খুঁজে সীমিত বিকল্প পেয়েছে। কিন্তু রাজশাহী থেকে আসা তুর্য ও তাঁর বন্ধুদের অভিজ্ঞতা ছিল আরও ভয়াবহ। তাঁদের প্রয়োজন ছিল পর্যটনের বাড়তি বিনোদন নয়, জীবন বাঁচানোর মতো মৌলিক সেবা।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর সুগন্ধা পয়েন্টের কাছেই গ্রীন ন্যাচার রিসোর্টের সামনে সমুদ্রের পানিতে ডুবে তুর্যদের বন্ধু সীমান্ত নিখোঁজ হলে তাঁরা তাৎক্ষণিক ডুবুরির খোঁজ করেন। পরে জানতে পারেন, সেখানে ডুবুরি নেই। ডুবে যাওয়া দুই বন্ধুকে উদ্ধার করে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে চাইলেও আশপাশে কোনো প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র পাননি তাঁরা। শেষ পর্যন্ত অটোরিকশায় করে সৈকত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের সদর হাসপাতালে নিতে হয় তাদের।
তখনও আশা ছিল, সি-অ্যাম্বুলেন্সে হয়তো পানিতে তলিয়ে যাওয়া তাদের আরেক বন্ধু সীমান্তকে দ্রুত উদ্ধারে নামা যাবে। কিন্তু জানতে পারেন, সী অ্যাম্বুলেন্সও নেই। শেষ পর্যন্ত লাইফগার্ড, বিচকর্মী ও ফায়ার সার্ভিস আড়াই ঘণ্টা পর ভেসে উঠা সীমান্তের মরদেহ উদ্ধার করে।
আনন্দ করতে এসে শেষ পর্যন্ত এক বন্ধুর মরদেহ কাঁধে নিয়ে রাতেই কক্সবাজার ছাড়তে হয় রাজশাহী থেকে আসা এই পর্যটকদের। সেই বিষাদের স্মৃতি তুলে ধরে তুর্য বলেন, পর্যটন শহরে এমন মৌলিক সেবার ঘাটতি তাঁকে হতাশ করেছে।
তুর্যদের মতো সমুদ্রে স্বজন হারানো অনেক পর্যটকের অভিযোগও একই। ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অরিত্র হাসান নিঁখোজের এক বছর পেরিয়ে গেল। তার বাবা সাকিব হাসান জানান, নিরাপত্তা-ই যদি না থাকে, কেন হোটেল মালিকরা তাদের জোনে পর্যটকদের গোসলে নামতে দিবে? বিপদজনক এরিয়ায় কেনইবা একটা লাল পাতাকা টাঙানো থাকলো না। আমার ছেলেরা তো শিক্ষিত, তারা অন্তত পতাকা দেখলেই সেখানে নামতো না। প্রশাসনকে এসব বিষয়ে দরখাস্ত দিয়েছি, প্রতি মাসে মাসে অরিত্রের খোঁজের বিষয়ে জানতে চেয়েছি, তারা শুধু দেখব, দেখছি বলেই আশ্বাস দেয়।
সিলেটের পর্যটক সুশান্তের অভিজ্ঞতাও খুব স্বস্তির নয়। সৈকতে পথশিশু ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের বিরক্তি, ময়লা-আবর্জনা এবং হকারদের হাঁকডাকে অনেক সময় নিরিবিলি সময় কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সমুদ্রের পাশে একটু নিরিবিলি সময় কাটানোও তার জন্য সহজ হয়নি।
সৈকতের তিন কিলোমিটার জুড়েই গোসলে নামে পর্যটক সেখানেও নিরাপদ নয়। দেড় কিলোমিটার সৈকতে ২৭ জন লাইফগার্ডের নজরদারিতে থাকে কিন্তু বাকি দেড় কিলোমিটারে গোসলে না নামার কোন নিষেধ বা নির্দেশনাও সৈকতে চোখে পড়ে না। লাইফগার্ড এরিয়ার বাইরেই ৩ বছরে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান সী সেইফ লাইফগার্ড।
# পর্যটন স্পট আছে, বৈচিত্র্য নেই
পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যটন রাজধানী নামে পরিচিতি দীর্ঘদিনের। দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই ছুটে আসেন লাখো পর্যটক। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে পর্যটনের বৈচিত্র্য কতটা বেড়েছে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে।
জেলা প্রশাসন পর্যটন করপোর্শেন ও সংশ্লিষ্ঠদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ককক্সবাজার জেলায় পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝর্ণা, পাথুরে সৈকত, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধ বিহার, রাবার বাগান, চা বাগান, গর্জন বিহার,টেকনাফের মাথিনের কূপ ও সেন্টমার্টন, কুতুবদিয়ার বাতিঘর ছাড়াও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তবে সেভাবে প্রচারণা না থাকায় পর্যটক আকর্ষণ করতে পারছেন না তেমন।
বিনোদনের ক্ষেত্রেও পর্যটকের জন্য সুযোগ সীমিত। শিশুদের জন্য পার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র, পরিবারের জন্য পরিকল্পিত বিনোদন, সন্ধ্যার পর নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ঘিরে আয়োজন, নাইট মার্কেট, ওয়াকওয়ে কিংবা তরুণদের জন্য বিচ স্পোর্টস ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক কার্যক্রম নেই। ফলে কয়েক দিনের জন্য কক্সবাজারে আসা পর্যটকের বিনোদনের বড় অংশই ঘুরেফিরে সৈকতকেন্দ্রিক হয়ে থাকে।
শুধু বিনোদন নয়, পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মৌলিক সেবাতেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, চেঞ্জিং সুবিধা, পর্যটকবান্ধব গণপরিবহন, সাইনেজ, হাঁটার অবকাঠামো, প্রতিবন্ধীবান্ধব সুবিধা একজন পর্যটকের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রয়োজনীয় এসব সেবা কতটা আছে! প্রতি বছর পর্যটন খাত থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু সেই রাজস্বের বিপরীতে পর্যটকদের জন্য কী কী স্থায়ী সুবিধা তৈরি হয়েছে সেই প্রশ্নও উঠছে।
পর্যটন নগরীর ব্যবস্থাপনা নিয়ে পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার রায়হান উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, "ব্যয়ের খাতও প্রচুর। সৈকতে লাইটিং, বিদ্যুৎ বিল, বিচকর্মীদের বেতন এবং নানা প্রোগ্রামে তাঁদের খরচ করতে হয়। তবে সরকার এক্সক্লুসিভ জোন করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পর্যটকরা আশা করছি সব ধরনের সুবিধা পাবেন।"
জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, কিছু জায়গায় আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। জেলা প্রশাসন ও মন্ত্রণালয় মিলে আমরা চেষ্টা করতেছি। এখানে সমুদ্রে অনেক সময় গোসলে নেমে পর্যটকরা ডুবে যায়। বীচকর্মী ও লাইফগার্ড আছে, পর্যটকদের তারা গোসলে নামার বিষয়ে সতর্ক করছে। কোন সময় নামা উচিত আর কোন সময় নামা উচিত না। ট্যুরিস্ট পুলিশ আছে, জেলা পুলিশের টহল জোরদার আছে। আমরা আশা করছি এর মাধ্যমে পর্যটকরা নিরাপদবোধ করবে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজলও পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, 'পর্যটনের জন্য মূলত কক্সবাজারে কিছুই নেই। প্রকৃতি ছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনার তেমন কিছু নেই এই শহরে।'
সরকার নতুন করে পর্যটন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবছে বলেও জানান তিনি। ১২০ কিলোমিটার সৈকতজুড়েই পর্যটনের হাব হবে বলে" তিনি জানান।
অথৈর শিশুপার্ক, অর্পিতার চাওয়া রাতের সাংস্কৃতিক আয়োজন। তুর্যের বিপদে পড়া বন্ধুর জন্য দ্রুত উদ্ধারসেবা।
প্রকৃতি কক্সবাজারকে এত কিছু দিয়েছে, পর্যটকের সেবার জন্য কতটা ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পেরেছে কক্সবাজার? প্রতিবছর পর্যটন থেকে যে রাজস্ব আসে, তার কতটা পর্যটকের নিরাপত্তা, বিনোদন, স্বস্তি ও স্থায়ী সুবিধায় ব্যয় হয় সেই প্রশ্নও সামনে আসে বারবার।