নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং, আর তাতেই ঝরে গেল এক পর্যটকের প্রাণ। রশি ছিঁড়ে সাগরে পড়ে মারা গেছেন খুলনার শৌভিক রয়। নিরাপত্তাহীন এই বিনোদন কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অনুমোদনহীন প্যারাসেইলিং পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজারের দরিয়ানগর সমুদ্রসৈকত; যার বালিয়াড়িতে রয়েছে পর্যটকদের জন্য প্যারাসেইলিং করার সুযোগ। শনিবার (০১ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা থেকে আসা নয়জনের একটি পর্যটক দল ঘুরতে এসে প্যারাসেইলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। একে একে সাতজন প্যারাসেইলিং সম্পন্ন করার পর শৌভিক রয় ওঠেন আকাশে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ছিঁড়ে যায় প্যারাসেইলিংয়ের রশি। সাগরে ছিটকে পড়েন তিনি। পরে উদ্ধার করে দ্রুত নেওয়া হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে যান কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। এসময় তিনি জানান, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রেসিডেন্ট বিচ এলাকায় ঢাকা থেকে আসা কয়েকজন পর্যটক প্যারাসিলিং করছিলেন। তারা প্রায় নয়জন বন্ধু ছিলেন, যাদের মধ্যে সাতজন প্যারাসিলিং সম্পন্ন করেন। পরে সৌভিক নামে একজন প্যারাসিলিংয়ে ওঠেন। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিচে পড়ে যান। তার সঙ্গে থাকা বন্ধুদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, তিনি খুব বেশি গভীর পানিতে পড়েননি; কোমরসমান পানির মধ্য থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে উদ্ধারের পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং জরুরি অবস্থায় তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সৌভিক ঢাকায় চাকরি করতেন এবং তার মা ও বোন খুলনায় থাকেন। ইতোমধ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে প্রশ্ন উঠেছে, পর্যটকদের জন্য পরিচালিত এই অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রমে কতটা মানা হচ্ছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা? স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছরে একই এলাকায় প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ পর্যটক। এর আগে দুর্ঘটনার পর প্রশাসন সাময়িকভাবে প্যারাসেইলিং বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কিছুদিন পর আবারও শুরু হয় কার্যক্রম।
প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য প্যারাসেইলিং পরিচালনার ব্যাপারে জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস’ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন ধরেননি।
প্রশাসনের দাবি, প্যারাসেইলিং পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমোদন নেই। বর্ষা-মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার মাঝে প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে অগোচরে কার্যক্রম চালানো প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, প্যারাসেইলিং পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, “প্যারাসেইলিং কার্যক্রম আমরা নিয়মিত বন্ধ করে থাকি। আমাদের পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচকর্মীরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন। গত সোমবারও ওই এলাকায় চলমান কয়েকটি প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও বলেন, “বর্ষাকালে সাধারণত সমুদ্র উত্তাল থাকে এবং আবহাওয়া প্রতিকূল হওয়ায় এ ধরনের কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণে আমরা প্যারাসেইলিং বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম। এরপরও আমাদের অগোচরে যে প্রতিষ্ঠানটি পর্যটকদের প্যারাসেইলিংয়ে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জেলা প্রশাসক বলেন, “কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকরা আনন্দ ও বিনোদনের জন্য আসেন। কোনো পর্যটকের সঙ্গে যেন এ ধরনের দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে এবং কারও জীবনহানি না হয়, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও, বাস্তবে অনুমোদন ছাড়াই চলছে কিছু বিনোদন কার্যক্রম। শৌভিক রয়ের মৃত্যুর পর আবারও সামনে এসেছে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি।