কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন কয়েক’শ রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছেন। টুপটুপ ট্র্যাজেডিতে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
তাঁরা বলছেন, ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। উচ্ছেদের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান বৃহত্তর মেরিন ড্রাইভ রোড রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির নেতারা। সংগঠনের সভাপতি সাদেক রুবেল লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে টুপটুপ ট্র্যাজেডিতে নিহত ১০ জনের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধা জানানো হয়। একই সঙ্গে তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
লিখিত বক্তব্যে সাদেক রুবেল বলেন, “হিমছড়ি, পেঁচার দ্বীপ, সোনারপাড়া, ইনানী ও পাটোয়ারটেকসহ মেরিন ড্রাইভের আশপাশে প্রায় ৫০০টি রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে মালিকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারীও জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।”
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে বাবুর্চি, ওয়েটার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেন স্থানীয় অনেক তরুণ। এ ছাড়া টমটমচালক, ফটোগ্রাফার, বিচ চেয়ার ও বাইকসেবাদাতা, ঘোড়ায় চড়ার সেবা প্রদানকারী এবং স্থানীয় পণ্য সরবরাহকারীদের আয়ও পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।
তাঁদের ভাষ্য, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন না; এর প্রভাব পড়বে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের পরিবারে। স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলেন, তাঁরা প্রশাসন বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিপক্ষ নন। বরং পর্যটন খাতের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চান। কোনো প্রতিষ্ঠানে ত্রুটি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা বলেন, অনেক হোটেল ও রেস্তোরাঁ উদ্যোক্তার পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নেই। এ কারণে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে এসব ত্রুটি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তা সংশোধন করা সম্ভব।
তাঁদের প্রস্তাব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শন করে কোনো প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত, অগ্নিনিরাপত্তা বা পরিচালনাগত ত্রুটি থাকলে তা লিখিতভাবে জানাবে। ত্রুটির ধরন অনুযায়ী সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। ব্যবসায়ীরাও সেই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে সংশোধনযোগ্য ত্রুটির ক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হলে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।
টুপটুপ ট্র্যাজেডির প্রসঙ্গ তুলে ব্যবসায়ীরা বলেন, এ ঘটনা হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এ জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানমালিক, ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের নিয়মিত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের দাবি জানান তাঁরা। আগুন লাগলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, অতিথিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত ত্রুটি সংশোধনে প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সি স্টোনের আবুল মঞ্জুর, ওশান ফ্রেন্ড রিসোর্সের খোরশেদ আলম, সেইলোর বিচ রিসোর্টের মাসুম রহমান, কোরাল স্টেশনের মো. জুয়েল ও সি ফিশ রেস্তোরাঁর আবু তাহের।