সাইফুল আফ্রিদি
মেগা প্রকল্পের আইকনিক রেলস্টেশন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা সৈকত ঘিরে কক্সবাজারকে পর্যটন নগরী বানানোর আয়োজন দৃশ্যমান। কাগজে-কলমে জেলা প্রশাসনের ‘ভ্রমণিকা’ অ্যাপের মতো উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে কক্সবাজারে নামামাত্রই দিকনির্দেশনাহীনতার মুখোমুখি হন পর্যটকেরা। তথ্য আড়াল ও সচেতনতামূলক প্রচারের অভাবে একদিকে যেমন সাগরে গোসলে নেমে পর্যটকদের সলিলসমাধি ঘটছে, অন্যদিকে যাতায়াতের সঠিক তথ্য না পেয়ে স্থানীয় পরিবহন সিন্ডিকেটের হাতে প্রতিনিয়ত পকেট কাটা যাচ্ছে পর্যটকের। পর্যটন শহরে পর্যটকদের জন্য কেমন তথ্য দৃশ্যমান শহরজুড়ে তার অনুসন্ধান করেছে দৈনিক কক্সবাজার। পুরো শহরে পর্যটকদের জন্য তেমন কোনো তথ্য চোখে না পড়লেও পুরো শহর এবং প্রবেশপথগুলোতে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড নজর কেড়েছে।
কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে পর্যটক পয়েন্টগুলোতে প্রশাসনিক তথ্য নির্দেশনার জায়গায় শোভা পাচ্ছে করপোরেট পণ্যের বিজ্ঞাপন। কলাতলী শহরের প্রবেশমুখে সওজের ‘ওয়েলকাম টু কক্সবাজার’ সাইনের পাশ থেকে পর্যটকের প্রথম চোখে পড়ে সাগরের নীল জলরাশি। সেই জলরাশি দেখার সাথে সাথেই চোখে পড়ে জেলা প্রশাসনের সরাসরি পরিচালনাধীন তথ্য কেন্দ্রের ওপর বসানো শাওমি মোবাইলের দানবীয় বিলবোর্ড।
নিরাপত্তা ও দিকনির্দেশনা আড়ালের একই চিত্র মিলেছে পর্যটক পয়েন্টগুলোতেও। শহরের কলাতলী ও সুগন্ধায় ট্যুরিস্ট পুলিশের বক্সে পর্যটন নির্দেশনার চেয়ে বেশি শোভা পাচ্ছে বাণিজ্যিক বিলবোর্ড। সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে ট্যুরিস্ট পুলিশের হেল্পডেস্কে লাইফগার্ডের জরুরি নম্বর বা বিপদসীমার সতর্কবার্তার চেয়েও বড় আকারে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে সার্ফ এক্সেলের বাণিজ্যিক ব্যানার।
পর্যটক হিমেল আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, 'কোথাও পর্যটনের তথ্য না থাকা নতুন পর্যটকদের জন্য পরিবেশটা বিপজ্জনক। নতুন পর্যটকেরা বিপদে পড়ার মূল কারণ প্রশাসনের তথ্য আড়াল ও সচেতনতার অভাব।'
পর্যটকদের এমন অভিযোগ ও হেল্পডেস্কে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার রিজিয়নের ট্যুরিস্ট পুলিশ সুপার নিশাত এ্যঞ্জেলা বলেন, 'এই বিষয়গুলো আমরা ভেবে দেখছি। পর্যটকদের তথ্য পাওয়া বিবেচনায় রেখে আমরা সেটি পুনর্বিবেচনা করব।'
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েমকে তথ্য ও অভিযোগকেন্দ্রের বক্সে বাণিজ্যিক বিলবোর্ড বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হলে তিনি ফোনে কথা বলতে চাননি। কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোনে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দেন না বলে ফোন কেটে দেন তিনি।
#৯৯.৮৮% পর্যটকের অজানা ‘ভ্রমণিকা’ অ্যাপ
জেলা প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভ্রমণিকা’ অ্যাপ চালু করলেও বাস্তবে তা পর্যটকদের কোনো কাজে আসছে না। অ্যাপটিতে ৪৫টি স্পটের তথ্য, এআই প্ল্যানার ও ই-ফেয়ার বোর্ড থাকলেও এর কোনো কিউআর কোড বা টিউটোরিয়াল শহরের বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন কিংবা ট্রাফিক পয়েন্টে নেই। বছরে পা রাখা ৮০ লাখ পর্যটকের বিপরীতে অ্যাপটির ডাউনলোড মাত্র ১০ হাজার। পরিসংখ্যান বলছে, ৯৯.৮৮ শতাংশ পর্যটকই জেলা প্রশাসনের এই অ্যাপের বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক মৃদুল জয় প্রশ্ন তুলে বলেন, 'অ্যাপ তৈরি করা আছে অথচ শহরের কোথাও কোনো কিউআর কোড বা নোটিশ নেই! তথ্য আড়াল করে কাদের লাভ হচ্ছে?'
#বিলবোর্ডে করপোরেট রাজত্ব
কেবল ডিজিটাল অ্যাপের প্রচারহীনতাই নয়, সরেজমিনে শহরের প্রবেশদ্বারগুলোতে এনালগ তথ্যবোর্ডের ক্ষেত্রেও মিলেছে চরম বাণিজ্যিক দখলের চিত্র। আইকনিক রেলস্টেশনের ভেতরের ১৬টি বিলবোর্ডের একটিতেও কোনো পর্যটন নির্দেশিকা বা ভাড়ার তালিকা নেই; ঝুলছে বিএসআরএম, ওয়ালটন, একেএস ও গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন। বাসস্ট্যান্ডের ১০টি বিলবোর্ডের চিত্রও একই।
ট্রেনে আসা পর্যটক সাইদুর রহমান বলেন, 'স্টেশন থেকে বের হতেই চালকেরা যার কাছ থেকে যেমন ইচ্ছা ভাড়া হাঁকছে। ফেয়ার বোর্ড থাকলে এই হয়রানি হতো না।'
তথ্য আড়ালের পেছনে পরিবহন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করেছেন কক্সবাজার রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার জয়নাল আবেদীন। তিনি বলেন, 'পৌরসভা থেকে দুটি টমটম ভাড়ার তালিকা টাঙানো হয়েছিল। কিন্তু পর্যটকেরা সঠিক তথ্য জেনে গেলে বাড়তি টাকা নেওয়া যাবে না দেখে অসাধু চালকেরা সেই ভাড়ার তালিকা ছিঁড়ে ফেলে।'
তবে বাইরের বিলবোর্ডের বাণিজ্যিক আধিপত্য নিয়ে তিনি বলেন, 'বিলবোর্ডগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে, এটি স্টেশনের জায়গা নয়।'
#বিজ্ঞাপনের ছাতায় মোড়ানো সৈকত, নেই কোনো সতর্কবার্তা
কেবল সড়কের মোড় নয়, প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতজুড়ে হাজার হাজার কিটক্যাট চেয়ারের ছাতাও এখন পুরোপুরি করপোরেট বিজ্ঞাপনের দখলে। সিমেন্ট, মোবাইল অপারেটর কিংবা কোল্ড ড্রিংকসের লোগো সংবলিত এসব ছাতার নিচে পর্যটকরা সারাদিন বিশ্রাম নিলেও সেখানে থাকে না কোনো নিরাপত্তা বা সচেতনতামূলক বার্তা। অথচ পর্যটকদের চোখের সামনে থাকা এই ছাতাগুলোর কাপড়ে লাইফগার্ডের জরুরি হটলাইন নম্বর, লাল পতাকার সংকেত কিংবা জোয়ার-ভাটার সতর্কবার্তা অনায়াসেই প্রিন্ট করে দেওয়া যেত।
লাইফগার্ড সংস্থাগুলোর হিসাব মতে, সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী পয়েন্টে মাত্র ৫০০ মিটার করে সর্বমোট দেড় (১.৫) কিলোমিটার এলাকায় লাইফগার্ডের উপস্থিতি ও সতর্কতামূলক ব্যানার রয়েছে। অথচ ১২০ কিলোমিটারের বিশাল সৈকতে বছরে পা রাখেন ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক।
গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১.৫ কিলোমিটারের এই সীমিত সৈকতপ্রান্তে একসাথে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ হাজার পর্যটক নিরাপদে গোসল করার সুযোগ পান। কিন্তু পিক-সিজনে প্রতিদিন কক্সবাজারে সমাগম ঘটে প্রায় এক লাখ পর্যটকের। ফলে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যটকই লাইফগার্ডের ব্যানার বা সতর্কবার্তা না দেখে অনিরাপদ ও অরক্ষিত পয়েন্টে সাগরে নামছেন।
প্রচারের এই চরম অভাবে প্রতিনিয়ত অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছে। লাইফগার্ড সংস্থার তথ্যমতে, ২০১৫ সাল থেকে বিগত ১২ বছরে কক্সবাজার সৈকতে সাগরে ডুবে ৮৬ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অজানা কক্সবাজারে নিয়ম না জেনে গোসলে নামা, পরিবহনে বিবাদ এবং হোটেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়ে বুকিং দেওয়ার ফলে অগ্নিদুর্ঘটনা সহ নানাভাবে মৃত্যু ঘটছে।
প্রশাসনিক তদারকির এই ঘাটতি এবং শহরের তথ্য কেন্দ্রের ওপর শাওমি বিলবোর্ড বসানোর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে জানিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, 'ভ্রমণিকা অ্যাপের প্রচার বাড়াতে অ্যানালগ প্রচারণায় জোর দেওয়া হবে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।'
তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্নিভালের ফানুস উড়িয়ে পর্যটন বাঁচানো যাবে না। শহরের প্রধান প্রবেশদ্বার ও পুলিশ বক্সগুলো থেকে বাণিজ্যিক বিলবোর্ড অপসারণ করে অন্তত ৩০ শতাংশ স্পেস ‘ভ্রমণিকা’ অ্যাপের কিউআর কোড, ই-ফেয়ার বোর্ড ও লাইফগার্ডের সতর্কবার্তার জন্য বাধ্যতামূলক করা জরুরি। তথ্য আড়াল করার এই সুযোগ বন্ধ না হলে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সত্ত্বেও পর্যটকদের কাছে অনিরাপদ থেকে যাবে কক্সবাজার।