কক্সবাজারে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত তিন দিন ধরে কক্সবাজারের হাসপাতালে রোগী ভর্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে ভোগান্তিও।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দেয়া তথ্য মতে, গত শুক্রবার (১৫ মে) হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪৬ জন। শনিবার (১৬ মে) তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬১ জনে। আর রোববার (১৭ মে) পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১৫৯ জন ছাড়িয়েছে।
বিশেষ করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ২০ শয্যার ‘হাম আইসোরেশন ওয়ার্ডে’ রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। সেখানে ২০ টি বেডের বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৮৭ শিশু। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। গত ২৯ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত কক্সবাজারে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছে ১৭ জন।
সরেজমিন দেখা যায়, কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে’ একটি বেডে ঠাঁই হয়েছে ২ থেকে ৪ শিশুর। কোথাও মেঝেতে, কোথাও স্বজনের কোলেই চলছে চিকিৎসা। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ওয়ার্ডজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ-রোগীর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ভোগান্তিও।
কক্সবাজারের সর্বোচ্চ সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জেলা সদর হাসপাতাল। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় চালু করা হয়েছে বিশেষ ‘হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড’। কিন্তু ২০ বেডের সেই ওয়ার্ডেই রোববার (১৭ মে) ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮৭। এর আগে গত শুক্রবার ভর্তি ছিল ৬১ জন, গত শনিবার ভর্তি ছিল ৭০ জন।
রোগীর চাপ বাড়লেও জনবল সংকট তীব্র। ৮৭ শিশুর বিপরীতে এক শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ১ জন মেডিকেল অফিসার, ২ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ৬ জন নার্স। সীমিত জনবল নিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের।
এদিকে, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে ভিড় স্বজনদের। তাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ঠিকমতো মিলছে না চিকিৎসাসেবা। একই সঙ্গে বাড়ছে ভোগান্তিও।
উখিয়ার টাইপালং থেকে আসা এক রোগীর অভিভাবক জসিম উদ্দিন বলেন, “হাসপাতালে ২০টি বেড থাকলেও সেখানে ৮০ জনের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। সারা দেশে হাম পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করায় চিকিৎসকদের এককভাবে দোষ দেওয়া যায় না। তবে অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার কারণে রোগীরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে না। বেড সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবাতেও ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসকরাও তুলনামূলক কম আসছেন ওয়ার্ডে।”
চকরিয়ার ডুলাহাজারা থেকে আসা অভিভাবক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, “ডাক্তাররা দিনে একবার আসেন, এরপর আর খোঁজ নিতে দেখা যায় না। হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুবিধা আছে কি না সেটাও আমরা জানি না। বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। এমনকি শিশুর জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সেটাও বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ওষুধ এনে দেওয়ার পরও অনেক সময় মেশিন সংকটের কারণে ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।”
আরেক অভিভাবক রশিদ আহমদ বলেন, “হাসপাতাল থেকে আমাদের শুধু একটি স্লিপ ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজনীয় সবকিছু বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে শিশু ভর্তি থাকায় আমরা সহজে ঢুকতে পারি না, ঠিকভাবে কথা বলতেও দেওয়া হয় না। অক্সিজেনসহ প্রয়োজনীয় যেকোনো জিনিস লাগলেই একবার বলে দেওয়া হয়, আর সবকিছুই আমাদের বাইরে থেকে সংগ্রহ করে আনতে হচ্ছে।”
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ বলেন, “মাত্র ২০ শয্যার বিপরীতে বিপুল সংখ্যক রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসা সেবা পরিচালনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি জানান, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড সচল রাখতে চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বর্তমানে সেখানে মাত্র পাঁচজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া গেলে রোগীদের আরও উন্নত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, ওয়ার্ডে স্থান সংকট থাকায় অতিরিক্ত বেড স্থাপন করা যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত বিছানা পেতে এবং অনেক ক্ষেত্রে এক বেডে দুই থেকে তিনজন শিশুকে রেখেই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সংকটের মধ্যেও ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।”
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত কক্সবাজারে হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ০৯৮ জন। এর মধ্যে ৪৪৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১১৯ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।