এম জাহেদ চৌধুরী
সাংবাদিক আহমদ গিয়াস আজ আর আমাদের মাঝে নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী এলাকার এই সাংবাদিক স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তার চলে যাওয়া আমার জন্য শুধু একজন সহকর্মীর মৃত্যু নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিচিত একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে তার জীবনসংগ্রাম আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমাদের দেশের মফস্বল সাংবাদিকতার আড়ালে কত মানুষের নীরব লড়াই চাপা পড়ে থাকে। পেশাগত নিষ্ঠা, মেধা ও সততা থাকার পরও একজন সাংবাদিককে জীবিকা নির্বাহের জন্য কতটা সংগ্রাম করতে হয়, আহমদ গিয়াসের জীবন তারই একটি প্রতিচ্ছবি।
দৈনিক চকোরী পত্রিকার মাধ্যমে তার সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক প্রফেসর এ কে এম গিয়াস উদ্দিন পরম স্নেহে তাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, তাকে একজন দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে তার মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে দৈনিক চকোরীকে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যাওয়া যায়।
আমার সান্নিধ্যে আসার পরই বুঝতে পেরেছিলাম, আহমদ গিয়াসের মধ্যে এক অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তার ছিল সহজাত মেধা, পর্যবেক্ষণক্ষমতা ও সৃজনশীলতা। কোনো বিষয় একবার বুঝিয়ে দিলে একই ধরনের সংবাদ কিংবা ফিচার সহজেই তৈরি করতে পারতেন। শুধু নির্দেশনা অনুসরণ করেই থেমে থাকতেন না; নিজের চিন্তা ও সৃজনশীলতা দিয়ে লেখায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করতেন।
তখনই মনে হয়েছিল, ছেলেটি একদিন অনেক দূর এগিয়ে যাবে। পরবর্তী সময়ে তার কাজ সেই বিশ্বাসেরই প্রমাণ দিয়েছে।
চকরিয়া থেকে কক্সবাজারে গিয়ে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। গবেষণাধর্মী লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। বিষয় বিশ্লেষণ, তথ্য অনুসন্ধান এবং লেখার নিজস্ব ধরন তাকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় এনে দেয়। তার মধ্যে যে সম্ভাবনা দেখেছিলাম, সাংবাদিকতা ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি তার স্বাক্ষর রেখেছেন।
কিন্তু মেধা ও যোগ্যতার এই অগ্রযাত্রার আড়ালে ছিল কঠিন জীবনসংগ্রাম। সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশের পর থেকে জীবিকা ও পেশাগত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, পেশাগত সততা বজায় রাখা এবং নিজের অভাব-অনটনের কথা প্রকাশ না করার প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। তার জীবনসংগ্রাম কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কিন্তু আজ তার চলে যাওয়ার পর সেই স্মৃতিগুলো আরও বেশি করে নাড়া দিচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সাংবাদিককে কেন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের জীবনধারণের নিশ্চয়তা নিয়েও প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হবে?
আমাদের গণমাধ্যমে মফস্বল সাংবাদিকদের শ্রম, মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। অনেক সাংবাদিক নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করেন, ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করেন, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরেন; অথচ তাদের বেতন-ভাতা থাকে অনিশ্চিত, চাকরির নিরাপত্তা দুর্বল এবং ভবিষ্যৎ অনেকটাই অজানা। কোথাও পেশাগত দায়িত্বের তুলনায় পারিশ্রমিক অপ্রতুল, কোথাও আবার সাংবাদিকতার পরিচয়টুকু থাকলেও জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য কাজের ওপর নির্ভর করতে হয়।
আহমদ গিয়াসের জীবনসংগ্রাম এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তার মতো একজন মেধাবী সাংবাদিককে যদি পেশাগত নিষ্ঠা বজায় রেখেও আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়তে হয়, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য সাংবাদিকের পরিস্থিতি কেমন, তা সহজেই অনুমেয়।
তবে এই সংকটের সমাধান শুধু ব্যক্তিগত সততা, মেধা কিংবা পরিশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন সাংবাদিক যতই দক্ষ হোন, তার কর্মস্থল যদি ন্যায্য পারিশ্রমিক, চাকরির নিরাপত্তা ও পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার পক্ষে সম্মানজনক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। সাংবাদিকের নিষ্ঠার পাশাপাশি প্রয়োজন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতিমালা।
আহমদ গিয়াসের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ঝুপড়ি ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিটি দেখে অনেকেই মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনসংগ্রাম নিয়ে কথা বলছেন। এই আলোচনা প্রয়োজনীয় হতে পারে, যদি তা কেবল সাময়িক আবেগে সীমাবদ্ধ না থাকে; যদি তা সাংবাদিকদের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগে রূপ নেয়।
কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, জীবদ্দশায় একজন সাংবাদিকের অভাব-অনটন, সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তার খোঁজ নেওয়ার আগ্রহ কতটা ছিল আমাদের? মৃত্যুর পর তার ঘরের ছবি দেখে ব্যথিত হওয়া সহজ; কিন্তু জীবিত অবস্থায় তার পাশে দাঁড়ানো, তার কাজের মূল্য দেওয়া এবং তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা আরও বেশি জরুরি।
একজন সাংবাদিকের প্রতি প্রকৃত সম্মান শুধু শোকবার্তা, স্মৃতিচারণ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সেই সম্মানের বাস্তব প্রকাশ হতে হবে তার জীবদ্দশায়, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
এ কারণেই মফস্বল সাংবাদিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি। নিয়োগনীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, প্রযোজ্য ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা, সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা জোরদার করা এবং বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) উত্থাপিত ১৪ দফা দাবি বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব দাবি আদায়ে সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মফস্বল সাংবাদিকেরা শুধু সংবাদ পরিবেশন করেন না; তারা প্রত্যন্ত জনপদের মানুষের কথা তুলে ধরেন, স্থানীয় অনিয়ম ও জনদুর্ভোগের খবর সামনে আনেন এবং সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অথচ তাদের নিজেদের জীবনের সংকট অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। এই বৈপরীত্য দূর করা প্রয়োজন।
আহমদ গিয়াসের চলে যাওয়া আমার জন্য গভীর বেদনার। তার মেধা, সৃজনশীলতা, পেশাগত নিষ্ঠা এবং সংগ্রামের স্মৃতি আমার কাছে থেকে যাবে। তার জীবন আমাকে যেমন একজন সম্ভাবনাময় সাংবাদিকের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি মনে করিয়ে দেয় আমাদের সাংবাদিকতা ব্যবস্থার কিছু কঠিন বাস্তবতার কথাও।
একজন আহমদ গিয়াসের মৃত্যুতে আমরা শোক প্রকাশ করছি। কিন্তু তার মতো আর কোনো সাংবাদিক যেন জীবিকার অনিশ্চয়তা ও অবমূল্যায়নের মধ্যে নীরবে সংগ্রাম করতে বাধ্য না হন, সেই দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে।
আহমদ গিয়াসের গল্প তাই শুধু একজন সাংবাদিকের জীবনসংগ্রামের গল্প নয়; এটি দেশের হাজারো মফস্বল সাংবাদিকের বাস্তবতা। তার স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন সাংবাদিকের মর্যাদা শুধু মৃত্যুর পর আলোচনার বিষয় না হয়ে জীবদ্দশায় তার অধিকার ও নিরাপত্তার ভিত্তি হয়ে উঠবে।
মহান আল্লাহতায়ালা মরহুম সাংবাদিক আহমদ গিয়াসকে জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা করুন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক: সাংবাদিক ও সহ-সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)।