জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চরম মূল্য দিচ্ছে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ইউনিয়নের ৯নম্বর ওয়ার্ড সাইরারডেইল (জালিয়াপাড়া) এলাকার মানুষ। সমুদ্রের মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একসময়ের শান্ত ও সমৃদ্ধ এই উপকূলীয় গ্রামটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এক জীবন্ত ও ক্ষতবিক্ষত প্রতিচ্ছবি। প্রতিনিয়ত সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ আর অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। গৃহহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ। অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও জনপ্রতিনিধিরা।
সরেজমিনে মাতারবাড়ির সাইরারডেইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শুধুই বুকফাটা হাহাকার। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই গ্রামে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানি অনায়াসে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে শত শত ঘরবাড়ি। নদী ও সমুদ্রের তীব্র ভাঙনে সাইরারডেইল এলাকার অর্ধেকের বেশি পরিবার তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে। বাস্তুচ্যুত হতে হতে এখন আর যাওয়ার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই এই উপকূলের বাসিন্দাদের।
সাইরারডেইল জালিয়াপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, "আমার বাপ-দাদার ভিটা এখন সমুদ্রের পেটে। তিনবার ঘর সরাইছি, এখন আর সরানোর মতো জমিও নাই, টাকাও নাই। আমাদের দেখার কেউ নাই।"
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাতারবাড়িতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে এলাকার ভৌগোলিক বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এই নির্দিষ্ট উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর। অথচ ভাঙনকবলিত সাইরারডেইল এলাকার মানুষের সুরক্ষায় স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলবায়ুর এই বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় শুধু অস্থায়ী বালুর বস্তা (জিওব্যাগ) ফেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই মহাপরিকল্পনা।
মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, সাইরারডেইলের ভাঙন এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন মানুষ ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। প্রশাসনকে বিষয়টি বারবার অবহিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এই মানুষগুলোকে বাঁচাতে হলে দ্রুত বড় আকারের পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
মহেশখালীর উপকূলীয় এই প্রান্তিক জনপদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের দ্রুত ও কার্যকরী হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।