টেকনাফে হিন্দুধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মতবিনিময় সভা সমাজে ধর্মীয় নেতাদের রয়েছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। কারণ সাধারণ মানুষ তাঁদের কথা শোনেন এবং পরামর্শকে গুরুত্ব দেন। তাই পূজা-পার্বণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের ঝুঁকি এবং নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের মাধ্যমে তাঁরা মানুষকে সতর্ক করতে পারেন।
বৃহস্পতিবার সকালে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। স্থানীয় হিন্দুধর্মীয় নেতাদের নিয়ে এই সভার আয়োজন করে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। অস্ট্রেলিয়ান সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ম্যাস ক্যাম্পেইন টু কমব্যাট হিউম্যান ট্রাফিকিং অ্যান্ড পিপল স্মাগলিং’ প্রকল্পের আওতায় এ আয়োজন করা হয়।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে টেকনাফ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ননী গোপাল শীল সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবারই সমাজের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আমরা সবাই বাংলাদেশি। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে।’
ননী গোপাল শীল আরও বলেন, ব্র্যাকের এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে টেকনাফের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে নিরাপদ অভিবাসনের সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া গেলে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে টেকনাফ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি শিব পদ ভট্টাচার্য বলেন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান টেকনাফের গুরুতর সমস্যায় পরিনত হয়েছে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে এ অঞ্চলের অনেক তরুণ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ প্রবণতা কমাতে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিব পদ ভট্টাচার্য টেকনাফের হিন্দু সম্প্রদায়ের সব ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে আলোচনা করার আহ্বান জানান। উপস্থিত ধর্মীয় নেতারাও এতে সম্মতি প্রকাশ করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও তরুণ সমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সীমান্তবর্তী এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন রোধে তরুণদের কর্মদক্ষতা উন্নয়ন, সঠিক তথ্য প্রচার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে টেকনাফের হ্নীলা শ্রী শ্রী কালী মন্দিরের সহকারী পুরোহিত অজয় চক্রবর্তী বলেন, এই সভায় অংশ নিয়ে তিনি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছেন। এ ধরনের আলোচনা ধর্মীয় নেতাদের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র ম্যানেজার সজিব কুমার পাণ্ডে। প্রবন্ধে তিনি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের ঝুঁকি, নিরাপদ অভিবাসনের গুরুত্ব এবং এসব অপরাধ প্রতিরোধে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা তুলে ধরেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কক্সবাজার জেলার সেন্টার ম্যানেজার মো. আজিমুল হকের সঞ্চালনায় সভায় টেকনাফ উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা, পুরোহিত, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক ও ব্র্যাকের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক দেশে ও দেশের বাইরে মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করে আসছে। সংস্থাটির মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ২০০৬ সাল থেকে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ, বিদেশফেরত অভিবাসীদের পুনরেকত্রীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং অভিবাসনসংক্রান্ত নীতিগত উদ্যোগে কাজ করছে।