কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকাকে অপহরণকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে র্যাব। সংস্থাটির দাবি, সাম্প্রতিক অধিকাংশ অপহরণের পেছনে রয়েছে মাদক-সংশ্লিষ্ট স্বার্থ ও অনলাইনের বিভিন্ন ফাঁদ।
এদিকে, ফেনী থেকে চাকরির প্রলোভনে চার যুবককে টেকনাফে এনে অপহরণের ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে র্যাব। অপহরণকারী চক্রের বিরুদ্ধে শিগগিরই বড় পরিসরের বিশেষ অভিযানেরও আভাস দিয়েছে বাহিনী।
রোববার দুপুরে র্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নটির উপ-অধিনায়ক মেজর এইচ এম মারুফ জানান, ফেনী থেকে চাকুরির প্রলোভনে চার যুবককে কক্সবাজারের টেকনাফ এনে অপহরণ ঘটনায় জড়িত দুই দুর্বৃর্ত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হল- টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী জুম্মাপাড়া মৃত সুলতান আহমদের ছেলে মো. রাসেল (২৮) এবং একই এলাকার রশিদ আহমদের ছেলে মো. আরমান (২১)।
ভুক্তভোগীরা হলেন, ফেনী জেলার এমাম হোসেন (১৯), জিসান (২৩) ও তৌহিদুল ইসলাম (১৯) এবং হবিগঞ্জ জেলার সুমন মিয়া প্রকাশ হোসাইন (২২)।
সংবাদ সম্মেলনে মেজর এইচ এম মারুফ বলেন, ফেনীতে চাকুরির সুবাদে ভুক্তভোগী ৪ যুবকের সঙ্গে মো. রাসেলের মধ্যে পরিচিতি ছিল। গত ২৬ জুন ওই যুবকদের চাকুরির প্রলোভনে দেখিয়ে টেকনাফ নিয়ে আসে রাসেল। পরে তাদের অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে টেকনাফের গহীন পাহাড়ের আস্তানায় জিন্মি রেখে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে দুর্বৃর্ত্তরা। মুক্তিপণ আদায় করায় জিন্মিদের উপর দুর্বৃর্ত্তরা শারীরিক নির্যাতন চালায়। ঘটনাটি অবহিত হওয়ার পর অপহৃতদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করে র্যাব ও পুলিশ।
এক পর্যায়ে গত ৩০ জুন র্যাব ও পুলিশের বিশেষ দল টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী জুম্মপাড়া সংলগ্ন গহীন পাহাড়ে অভিযান চালায়। এতে দুর্বৃত্তদের আস্তানাটি ঘিরে ফেললে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে জিন্মিদের ফেলে পালিয়ে যায়। পরে অপহৃত ৪ জিন্মিকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় উদ্ধার ভুক্তভোগী জিসান বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
র্যাবের এ ব্যাটালিয়ন উপ-অধিনায়ক বলেন, “ মামলাটি নথিভূক্ত হওয়ার পর থেকে ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে র্যাব অভিযান শুরু করে। এক পর্যায়ে শনিবার রাতে টেকনাফের রঙ্গিখালী সংলগ্ন গহীন পাহাড়ী আস্তানাটিতে মামলার আসামিরা অবস্থানের খবর পায় র্যাব। পরে র্যাবের একটি বিশেষ দল সেখানে অভিযানে গেলে ৪/৫ জন সন্দেহজনক লোক দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা চালায়। এসময় ধাওয়া দিয়ে ২ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলেও অন্যরা পালিয়ে যায়।”
গ্রেপ্তার আসামিদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান, মেজর এইচ এম মারুফ।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র্যাবের উপ-অধিনায়ক মেজর এইচ এম মারুফ বলেন, বর্তমানে সংঘটিত অধিকাংশ অপহরণের ঘটনা শুধু মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে হচ্ছে না। এসব ঘটনার সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এছাড়া অনেকেই অনলাইনের বিভিন্ন ফাঁদে পড়ে অপহরণের শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, “র্যাবের পক্ষ থেকে যে পরিসংখ্যান আপনাদের দেওয়া হয়েছে, সেটি খুবই স্বল্প সময়ের। সারা বছরজুড়েই প্রতি মাসে এ ধরনের অপহরণের ঘটনা ঘটে। আমরা সব সময় প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং করি না। তবে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের সঙ্গে শেয়ার করা হয়। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।”
মেজর মারুফ জানান, টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় অপহরণের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটছে। এসব এলাকার বিষয়ে যদি আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে র্যাব অপরাধী চক্রকে গ্রেপ্তারে আরও বড় পরিসরে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করবে।
তিনি বলেন, “সম্মানিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গেও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। এত বড় একটি অপরাধ নির্মূলে শুধু একটি বাহিনীর পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছে। এ অপরাধ সমূলে নির্মূল করতে হলে সব বাহিনীর চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি র্যাব এলিট ফোর্স হিসেবে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেসব টার্গেটেড অপারেশন পরিচালনা করে, ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।”
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তবে অপহরণ পুরোপুরি নির্মূল করতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মেজর মারুফের ভাষ্য, “যেসব এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে, সেখানকার মানুষের কাছ থেকে সময়মতো তথ্য পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। আশা করি, জনগণের সহযোগিতা পেলে এ অপরাধ দমনে আরও সফল হওয়া সম্ভব হবে।”
মেজর মারুফ আরও বলেন, টেকনাফের পাহাড়ি এলাকাগুলো দুর্গম হওয়ায় সেখানে চলাচল ও অভিযান পরিচালনা তুলনামূলকভাবে কঠিন। অনেক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কম থাকায় অপরাধীরা এসব এলাকা ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তবে সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে র্যাব নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, “টেকনাফ উপজেলায় র্যাবের দুটি ক্যাম্প রয়েছে। সেখান থেকে প্রতিনিয়ত অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য স্থান থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে এসব এলাকায় অভিযান পরিচালনা আমাদের জন্য কঠিন হবে না।”
মেজর মারুফ জানান, অপহরণের অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীরা পাহাড়ি এলাকাকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে র্যাবের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এ প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে বড় পরিসরের বিশেষ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষা রোহিঙ্গারা তুলনামূলক দ্রুত রপ্ত করে ফেলতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে মিশে অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা করে। তবে সব অপহরণের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে-এমন ধারণা সঠিক নয়।