অধিক লাভের আশায় কক্সবাজারের কৃষকরা সরিষা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। অল্ল খরচে বেশি লাভ হওয়ায় বাড়তি ফসল হিসেবে সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন তারা। সরিষার হলুদ ফুল ও সবুজ গাছে ছেয়ে গেছে কৃষকের ফসলের মাঠ।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অনান্য বছরের তুলনায় এ বছর সরিষার সর্বোচ্চ ফলন পেতে যাচ্ছে কক্সবাজার। কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে ভোজ্যতেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে সরিষা চাষ। আবাদি জমি বাড়ায়, বাড়ানো হয়েছে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও। বেড়ে ওঠা গাছ আর ফুল দেখে অধিক ফলনের স্বপ্ন দেখছেন জেলার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার চাষি।
জেলার চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, সদরসহ বেশকিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিগন্তজোড়া মাঠ ছেয়ে গেছে সরিষার হলদে ফুলে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ভালো ফলনের প্রত্যাশা সরিষা চাষীদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সরিষা চাষ হয়েছে, চকরিয়াতে। এ উপজেলায় ৫৮২ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। পেকুয়া ২৮২ হেক্টর, রামু ২৫২ হেক্টরসহ আট উপজেলায় ১ হাজার ২৮২ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার হেক্টর। ২০২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৮২৩
হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছিল। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯২৫ হেক্টর। যেখান উৎপাদন হয়েছিলো ১২০৩ হেক্টর। দুই বছরের ব্যবধানে সরিষা বেড়েছে ১৫০০ হেক্টর।
চাষীরা জানান, সরিষা তেলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সরিষার দাম এখন বেশ ভালো। বাজার পরিস্থিতি এমন থাকলে এবারও সরিষা বিক্রি করে ভালো আয় করা যাবে।
চকরিয়া শাহারবিল ইউনিয়নের রামপুর এলাকার কৃষক দুদু মিয়া ৩ একর জমিতে বারি - ১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। যেখানে বিঘাপ্রতি সাড়ে ছয় মন পর্যন্ত উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন তিনি। দুদু মিয়া বলেন, 'গেলো বছর সরিষা চাষ করে লাভবান হওয়ায় এ বছর আরও বেশি জমিতে সরিষার চাষ করেছি।'
খরুলিয়া ৭ নং ওয়ার্ডের সরিষা চাষী কাদের হোসাইন বলেন, ' ১ একর জমিতে তিনি সরিষার চাষ করেছেন। সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনা সহায়তা হিসেবে বীজ, সার পেয়েছেন। গত বছর লাভবান হওয়ায় এ বছর তিনি আরও বেশি জমিতে সরিষার চাষ করেছেন। সব খরচ বাদ দিয়ে কাদের হোসেনের ১ লাখ টাকা আয় হবে বলে তিনি জানান।'
একই ওয়ার্ডের মোজাহের ও সাকিব ৬০ শতক করে ১২০ শতক জমিতে সরিষার ক্ষেত করেছেন। তারা জানান, 'আমনের পর পড়ে থাকা জমিতে সরিষা লাগিয়েছি। এখন ফুল থেকে শিম চলে এসেছে। আগামী ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি সময়ে কর্তন করতে পারবো।'
সরিষা চাষি ছুরুত আলম বলেন, ' ৬০ শতক জমিতে সরিষা লাগিয়েছি। কৃষি অফিস থেকে কমিটি করে, প্রণোদনার ৮ কেজি বীজ, ১৫০ কেজি এমওপি ও ডিএপি সার পেয়েছি। এজন্য খরচ তেমন হয়নি। গত বছর ( ২০২৫ ) ১৪০ শতক জমিতে সরিষার আবাদ করেছিলাম। খরচ বাদ দিলে দুই মাসের ব্যবধানে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছি। '
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, 'কম খরচ, কম পরিশ্রম আর অল্পসময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় বলে সরিষা চাষে আগ্রহ বেড়েছে চাষীদের। ৩-৪ হাজার টাকা খরচ করে বিঘাপ্রতি চলতি মৌসুমে গড়ে সাত-আট মণ সরিষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিঘা প্রতি সাত মন সরিষা উৎপাদনে দাম কেজিতে ১০০ টাকা করে হলে দাঁড়ায় ২৮ হাজার টাকা। এছাড়া বারি-১৪ জাতের সরিষায় উৎপাদন করায় আবাদ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।'
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: সোহেল রানা দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, ' মাত্র ৭৫ দিনে ফসলটিতে সেচেরও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। চাষের সময় সামান্য সারেই পর্যাপ্ত ফলন পাওয়া যায়। এ কারণ, বাড়ছে সরিষার আবাদ। কৃষকদের উৎসাহ বাড়াতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খুরুশকুল, খরুলিয়া, পিএমখালিসহ বেশ কিছু এলাকায় কৃষকেরা সরিষা চাষ করেছেন। সুন্দর ফলন হয়েছে। আগামী মাসে সরিষা কাটতে পারবেন। এর পরপরই বোরোধান আবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বীজতলা তৈরি কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে।'
ফলন লক্ষ্য মাত্রা নিয়ে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ' চলতি মৌসুমে কৃষক উন্নত জাতের সরিষা চাষ করেছেন। এ কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরও বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'আমনের পরপরই পড়ে থাকা খালি জমিতে কৃষকেরা সরিষা ক্ষেত করেছেন।
বারি -১৪ জাতের সরিষা উৎপাদন করায় ফলনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। চাষিরা প্রতি বিঘা জমি থেকে ৫- ৭ মন সরিষা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। '