সমুদ্রের ঢেউ যেন শুধু জলরাশি নয়, একেকটি স্বপ্নের প্রতীক। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে জড়ো হয়েছেন দেশের সেরা ৭০ জন নারী ও পুরুষ সার্ফার। তাদের চোখে-মুখে একটাই লক্ষ্য-ঢেউ জয় করে লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) ৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্টকে ঘিরে সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্টের বালুচর উৎসবের রঙে রঙিন। প্রতিযোগীদের উচ্ছ্বাস, দর্শকদের আগ্রহ-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। এদিকে, পর্যটন ও সার্ফিংকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
সমুদ্রের গর্জন আর একের পর এক ছুটে আসা ঢেউ-প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের মাঝেই স্বপ্ন বুনছেন বাংলাদেশের তরুণ সার্ফাররা। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত-শুক্রবার সকালটা যেন রূপ নেয় এক উৎসবমুখর অঙ্গনে। এখানে বসেছে ৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্ট। আর সেরা ৭০ জন নারী ও পুরুষ সার্ফার জড়ো হয়েছেন এক স্বপ্ন নিয়ে-ঢেউ জয় করে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করা, আর লাল-সবুজের পতাকাকে পৌঁছে দেওয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
প্রতিটি ঢেউ এখানে শুধুই জলরাশি নয়, যেন একেকটি চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জকে সাহস আর দক্ষতায় মোকাবিলা করছেন প্রতিযোগীরা। কেউ পড়ে যাচ্ছেন, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন-কারণ তাদের লক্ষ্য একটাই, জয়।
সার্ফার মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, সার্ফিং প্রতিযোগিতা দীর্ঘ সময় পর আবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমাদের আশা, এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কক্সবাজার সার্ফিং এবং সার্ফাররা আরও এগিয়ে যাবে। তবে আমরা সার্ফিং ফেডারেশন ও এসোসিয়েশনকে আহ্বান জানাই, যেন প্রতি তিন বা ছয় মাস অন্তর এই ধরনের প্রতিযোগিতা চালু রাখা হয়, যাতে সার্ফিং বাংলাদেশের মধ্যে আরও উন্নয়ন লাভ করতে পারে।
সার্ফার মান্নান বলেন, বিশ^ মঞ্চে সার্ফিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে তুলে ধরা এটি আমার স্বপ্ন, যা সব সার্ফারের স্বপ্নও বটে। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে এশিয়া গেমসে প্রথমবার সিলেক্ট হওয়ায় এই স্বপ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো করলে আমরা ভবিষ্যতে ক্যালিফোর্নিয়া বা হাওয়াই-সহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সার্ফিং করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।
সার্ফারর মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ৮ম জাতীয় সার্ফিং এ অংশগ্রহণ করছি বড় আশা নিয়ে। কয়েক দিন আগেই দেশের জন্য খেলেছি, এবারও দেশের সম্মান নিয়ে আসছি। আমার লক্ষ্য এখানে সেরা পারফরম্যান্স দিয়ে প্রথম হওয়া এবং তারপর এশিয়ান গেমসের জন্য নির্বাচিত হওয়া। জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে দেশের নাম গৌরবময় করতে চাই।
এদিকে টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন ১৪ জন নারী সার্ফারও। তাদের মধ্যে রয়েছে দেশের প্রথম নারী সার্ফার নাছিমা আক্তার, শবে মেহেরাজ ও ফাতেমা। তারাও ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে তারাও পিছিয়ে নেই, বরং দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নিজেদের স্বপ্নের পথে। তাদের লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতায় ভালো করা নয়-বাংলাদেশে সার্ফিংয়ে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো, নতুন প্রজন্মের নারী সার্ফারদের অনুপ্রাণিত করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেওয়া।
নারী সার্ফার ফাতেমা বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি সার্ফিং করতেও সময় দিয়ে থাকি। আমার অনেক স্বপ্ন আছে-অলিম্পিকে অংশ নেওয়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সার্ফিং করা এবং দেশের জন্য খেলে আসা। আমি বিদেশে সার্ফিং প্রতিযোগিতায় গিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং এখানের মেয়েদের কিভাবে সার্ফিং করা হয় তা শিখেছি। জাপানে ভাল সার্ফিং উপহার দিতে কঠোরভাবে অনুশীলন করছি।
নারী সার্ফার শবে মেহেরাজ বলেন, আমি ২০১২ সাল থেকে কক্সবাজারে সার্ফিং করি। আমরা তিনজন মেয়ে নিয়মিত দৈনিক প্রায় ৫০ জনকে সার্ফিং শিখাই। আমাদের স্বপ্ন হলো মেয়েদের সংখ্যা আরও বাড়ানো—৫০ বা ১০০ জন নারী সার্ফার হয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানে তুলে ধরা। আমরা বিশেষভাবে মেয়েদের জন্য একটি সার্ফিং ক্লাবও গড়ে তুলতে চাই।
দেশের প্রথম নারী সার্ফার নাছিমা আক্তার বলেন, আমি নাসিমা, বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার। আজকের সার্ফিং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। আমার ক্লাবের নাম নাসিমা গার্লস সার্ফ স্কুল। আমার স্বপ্ন হলো নারীদের জন্য আলাদা সার্ফিং ক্লাব তৈরি করা, যেখানে আরও অনেক মেয়ে প্রফেশনাল সার্ফার হয়ে বিদেশে অংশগ্রহণ করবে এবং বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে। আমি ইতিমধ্যেই আমার ক্লাব শুরু করেছি এবং মেয়েদের জন্য এই উদ্যোগকে আরও বড় করতে চাই।
শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এই আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। সার্ফিংকে ঘিরে নতুন করে সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলেন, আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সীমাবদ্ধতা। সরকারি ও ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা পেলে আমরা সার্ফিংকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরতে পারব এবং কক্সবাজার ও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারব।
সার্ফিং এখন দেশের ক্রেজের পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমরা প্রথমবার দেশের সীমা পেরিয়ে এশিয়া ও বিশ্ব পর্যায়ে পৌঁছেছি। আইএসএ ও এশিয়ান সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার হিসেবে সম্প্রতি তিনবার এশিয়ান কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করেছি এবং জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে যোগ্যতা অর্জন করেছি। আমাদের সাফল্য কারোর দয়ায় নয়, আমাদের যোগ্যতার ফল। ভবিষ্যতে আরও দূর এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব:) মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, সার্ফিং এমন একটি খেলা যা অল্প খরচে নিজের চেষ্টায় উন্নত করা যায়। যেমন ক্রিকেটে আমরা দেশের জন্য সোনা এনেছি, ইনশাআল্লাহ সার্ফিংয়ের মাধ্যমে আমরা আরও অনেক সাফল্য নিয়ে আসতে পারব। তিনি খেলোয়াড়দের আরও মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
এদিকে, ৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্ট উদ্বোধনকালে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন-পর্যটন ও সার্ফিংকে এগিয়ে নিতে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ। তিনি বলেন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, জাতীয় পর্যায়ে সার্ফিং খেলা উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সার্ফারদের স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে এবং সফল হতে সহায়তা করার জন্য সরকার সর্বদা পাশে থাকবে। তিনি আশ্বাস দেন যে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সব ফেডারেশন স্বাবলম্বী হয়ে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারে।
এই প্রতিযোগিতা শুধু একটি খেলাই নয়, বরং তরুণ-তরুনীদের স্বপ্ন দেখার এক মঞ্চ। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে যারা এগিয়ে যাচ্ছেন, তারাই একদিন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবেন বিশ্ব দরবারে।
এদিকে ৮ম জাতীয় সার্ফিং টুর্নামেন্টের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল, জেলা প্রশাসক এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সার্ফিং এসোসিয়েশন জানায়-সার্ফিং টুর্নামেন্টে বিচারকের দায়িত্বপালন করছে মো. সাইফুল্ল্যাহ সিফাত, রাশেদ আলম ও মো. আব্দুল্লাহ। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিন (০৪ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হবে পুরুষদের কোয়াটার ও সেমিফাইনাল ও ফাইনাল, নারীদের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল এবং জুনিয়রদের সেকেন্ড রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমি ও ফাইনাল।