বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের জন্য বড় স্বস্তির খবর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রামুর রশিদনগরে ফিফার অর্থায়নে নির্মিত হতে যাচ্ছে ‘বাফুফে টেকনিক্যাল সেন্টার’। যার জন্য সরকার মাত্র এক লাখ এক টাকা প্রতীকী মূল্যে ১৫ দশমিক ২০ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের ফুটবলে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত আধুনিক প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার পথও খুলে গেল।
তবে ফিফার অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বড় শর্ত ছিল জমির দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা বা দখল। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বাফুফের নামে অন্তত ২০ বছরের স্থায়ী মালিকানা বা দখল না থাকলে এ ধরনের অনুদান পাওয়া সম্ভব নয়। সেই শর্ত পূরণ করে রামুর বরাদ্দকৃত জমি প্রথম ধাপে ৩০ বছরের জন্য লিজ পাচ্ছে বাফুফে। ভবিষ্যতে এই লিজের মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৯৯ বছর পর্যন্ত করার সুযোগও রয়েছে।
ফলে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে এখন টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের বাস্তব কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের ফুটবলারদের উন্নত প্রশিক্ষণ, জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ প্রতিভা তৈরিতে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা বাফুফের।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে ম্যানেজার (মিডিয়া) সাদমান সাকিব স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার (০৭ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে বাফুফের কাছে ওই জমি হস্তান্তর করা হবে। এ উপলক্ষে দুপুর ১২টায় কক্সবাজারের হোটেল লং বিচে জমি হস্তান্তর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এবং বাফুফের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা। পরে দুপুর ২টায় রামুর রশিদনগরে বরাদ্দকৃত জমি পরিদর্শন করবেন তারা।
এদিকে বাফুফে সহ-সভাপতি ওয়াহিদউদ্দীন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, টেকনিক্যাল সেন্টারের জন্য সরকার বিশেষ বিবেচনায় প্রতীকী মূল্যে জমিটি বরাদ্দ দিয়েছে। এক লাখ এক টাকা প্রতীকী মূল্য ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। জমি হস্তান্তরের পর টেকনিক্যাল সেন্টারের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করবে বাফুফে।
প্রায় চার বছর আগে বাফুফের সাবেক সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের সময়ে কক্সবাজারে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় রামুর খুনিয়াপালং এলাকায় ২০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কারণে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আপত্তি ওঠে। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন আটকে থাকে।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্র্বতীকালীন সরকার আগের বরাদ্দ বাতিল করে বিকল্প জায়গা খুঁজতে নির্দেশ দেয়। এতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শেষ পর্যন্ত নতুন জায়গা নির্ধারণ করে সেই জটিলতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ফিফার শর্ত অনুযায়ী বাফুফে দীর্ঘমেয়াদি লিজের ভিত্তিতে জমিটি ব্যবহার করবে। জমি হস্তান্তরের পরই টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আধুনিক এই টেকনিক্যাল সেন্টারে থাকবে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ, খেলোয়াড় ও কোচদের জন্য দুটি চারতলা ডরমিটরি, জিমনেসিয়াম, সুইমিংপুল, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা, ক্যানটিন এবং কনফারেন্স কক্ষসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
ক্রীড়াপ্রেমীদের আশা, এই টেকনিক্যাল সেন্টার দেশের ফুটবলের উন্নয়ন, খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্য ইয়াছির আরাফাত বিপু বলেন, ‘ক্রীড়া হল পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’-এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্রীড়া উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় রামুতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে ১৫ দশমিক ২০ একর জমি বিনামূল্যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের কাছে জমিটি হস্তান্তর করা হবে। এটি কক্সবাজারবাসী ও ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বড় সুখবর।
তিনি বলেন, এই মাঠে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হলে কক্সবাজার থেকে আরও প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে আসবে। জিকু, ইব্রাহিম ও সুশান্তের মতো খেলোয়াড়রা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কক্সবাজার থেকে মানসম্মত খেলোয়াড় তৈরিতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
কক্সবাজার জেলা ফুটবল খেলোয়াড় সমিতির সভাপতি এম. জাহেদ উল্লাহ বলেন, কক্সবাজারের রামুর রশিদনগরে ফিফার অর্থায়নে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। প্রায় আট কোটি টাকা মূল্যের জমি মাত্র এক লাখ এক টাকা প্রতীকী মূল্যে বাফুফেকে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবলের দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, এই টেকনিক্যাল সেন্টারে তিনটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ, খেলোয়াড়দের আবাসন এবং অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। এটি শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো দেশের ফুটবলের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এম. জাহেদ উল্লাহ আরও বলেন, এই টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মিত হলে কক্সবাজারের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। এখান থেকে ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার মতো খেলোয়াড় তৈরি হবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ফুটবলের উন্নয়নে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য কক্সবাজারবাসীর পক্ষ থেকে ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকেও ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি, রামুর এই টেকনিক্যাল সেন্টার বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন ও নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরিতে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
কক্সবাজার জেলা ক্রীড়া অফিসার মো. আলাউদ্দিন বলেন, টেকনিক্যাল সেন্টারে তরুণ ও উদীয়মান ফুটবলারদের আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এখানে ফুটবলের বেসিক থেকে শুরু করে প্রফেশনাল পর্যায়ের টেকনিক্যাল ও স্কিলভিত্তিক প্রশিক্ষণ-থিওরিটিক্যাল ও প্র্যাকটিক্যাল দুইভাবেই দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, একজন দক্ষ ফুটবলার তৈরিতে এ ধরনের টেকনিক্যাল সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারে দেশের এমন একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠলে শুধু স্থানীয় নয়, সারাদেশের প্রতিভাবান ফুটবলাররা এখানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে দক্ষ খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম বাড়বে বলে আমরা আশা করি।