জুলাই শহীদ ওয়াসিম আকরামের পেকুয়ার দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের বাড়ির দক্ষিণের উঠোন আর ইটের রাস্তাজুড়ে তখনও হাঁটুসমান পানি। বন্যার পানি কেবল নামতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের আগস্টেও এ গ্রাম বন্যায় তলিয়ে গিয়েছিল। তিন বছর পর ২০২৬ সালে আবারও ডুবেছে দক্ষিণ মেহেরনামা।
সেই বন্যার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে মা জোসনা বেগমের। কারণ, ২০২৩ সালের বন্যার সময় চট্টগ্রাম শহর থেকে ছুটে এসেছিলেন ছেলে ওয়াসিম। গ্রামের রাস্তা ডুবে থাকায় সাঁতার কেটেই বাড়িতে পৌঁছাতে হয়েছিল ওয়াসিমকে। আসার পথে বাজার থেকে শুকনো খাবার এনে পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছিলেন, নানা কাজও করেছিলেন।
কিন্তু তিন বছর পর এবারও বন্যার পানি তার বাড়ির উঠোন ছুঁয়েছে। কিন্তু ফিরে এলেন না ওয়াসিম। আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তাঁকে হারানোর দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘষে নিহত হন ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ।
গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেলে দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামে ওয়াসিমের বাড়িতে কথা হয় ওয়াসিমের মা জোসনা বেগমের সঙ্গে। তিনি ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। ঘরের এক কোণে যত্ন করে রাখা ছেলের পাওয়া ক্রেস্ট, বিভিন্ন উপহার ও ছবিগুলো বারবার স্পর্শ করেন। কথা বলতে বলতেই ভিজে ওঠে তাঁর চোখ।
আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘পোয়ার হতা বেশি মনত পরে বাজি। তিন বছর আগে এ রহম বন্যাত সাঁতার হাডি ওয়াসিম ঘরত আইস্যিল। আইবর সমত বাজারত্তুন খাবার লই আসস্যিল, বাড়িত বেশি খাটুনি গইজ্জ্যে।’
অর্থাৎ, ‘ছেলেকে খুব মনে পড়ে। তিন বছর আগে এমন বন্যায় সাঁতার কেটে বাড়ি এসেছিল ওয়াসিম। বাজার থেকে শুকনো খাবার এনেছিল। বাড়ির সব কাজও করেছিল।’
ছেলেকে হারানোর পর জোসনা বেগমের রাত যেন তাঁর কাছে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। ঘুম এলেও কান্নায় ভেঙে যায়। কখনো মোবাইল ফোনে সংরক্ষিত ছেলের কণ্ঠস্বর শোনেন, কখনো চুপচাপ বসে থাকেন। দিনের বেলায় সুযোগ পেলে চলে যান কবরের পাশে।
কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘কবরের পাশে গেলে আসতে মন চায় না। মনে হয়, ছেলেটা এখানেই আছে। খুব কষ্ট লাগে।’
‘শেষ বেলা, শেষবার’
ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম সৌদি আরবে থাকাকালে ছেলের মৃত্যুসংবাদ শুনে তাঁর যেন পৃথিবীটাই থমকে গিয়েছিল। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে সঙ্গে সঙ্গে দেশে ফিরতে পারেননি। এক মাস ১৭ দিন পর দেশে ফিরে প্রথম ছেলের কবরের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এরপর তিনি আর প্রবাসে ফেরেননি।
সম্প্রতি পেকুয়া সদর ইউনিয়নের চৈরভাঙ্গা এলাকায় ইজারা নেওয়া তাঁর মাছের ঘেরে কথা হয়। দিনের বেশির ভাগ সময় এখন সেখানেই কাটান তিনি। ঘের থেকে কিছুটা দূরেই ছেলের কবর। প্রতিদিন সেখানে যান।
বারবার তাঁর মনে ফিরে আসে ছেলের বলা একটি বাক্য-‘শেষ বেলা, শেষবার।’
তখন তিনি বুঝতে পারেননি, সেটিই ছিল বিদায়ের ইঙ্গিত।
শফিউল আলম বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল, ছেলের মুখে “বাবা” ডাক আর শুনতে পাই না। এই কষ্টটা বুকের ভেতর জমে আছে।’
তিনি জানান, একসময় তাঁর স্বপ্ন ছিল ছেলে সরকারি চাকরি করবে। কিন্তু ওয়াসিমের পরিকল্পনা ছিল কানাডায় যাওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতির জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে জমি বন্ধক রেখে প্রায় ১৯ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল।
শফিউল আলম বলেন, ‘বড় ছেলে আর ওয়াসিমকে নিয়ে সংসারটা দাঁড় করাতে চেয়েছিলাম। সবকিছু ধীরে ধীরে গুছিয়ে আসছিল। কিন্তু ছেলের মৃত্যু আমাদের সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে।’
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় পরিবার
ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত ৫ এপ্রিল ২২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোসনা বেগম চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন।
তবে মামলার অগ্রগতি নিয়ে খুব একটা খোঁজ রাখেন না শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘মামলার বাদী ওর মা। আমি শুধু চাই, দোষীদের শাস্তি হোক, আর নির্দোষরা যেন মুক্তি পায়। কেউ বিনা অপরাধে শাস্তি পেলে আমাদের সন্তানরা কবরে শান্তি পাবে না।’
মা জোসনা বেগমের কণ্ঠেও একই আকুতি, ‘দুই বছর হয়ে গেল। এখনো বিচার হলো না। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’
ওয়াসিমের ছোট বোন সাবরিনা ইয়াসমিন সোমা বলেন, ‘আমার ভাই দেশের গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন। আজ দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া-আমার ভাইসহ যারা জীবন দিয়েছেন, তাঁদের হত্যাকারীদের বিচার হোক। সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
পরিবার যা পেল
ওয়াসিমের পরিবার জানিয়েছে, গত ১৩ জুন পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেহেরনামার মুরারপাড়ায় ওয়াসিমের কবর জেয়ারত পরবর্তী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাক্ষাৎকালে ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম ও মা জোসনা বেগমের হাতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র হস্তান্তর করেন।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তিন দফায় ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা এবং এনসিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছে পরিবারটি।
জানতে চাইলে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহ বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ওয়াসিমের কবর পাকা করা হয়েছে, নামফলক বসানো হয়েছে। ওয়াসিম স্মৃতি সংসদ গঠন করা হয়েছে। তাঁদের বাড়ির সড়ক সংস্কার করা হয়েছে।’
এদিকে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আজ (বৃহস্পতিবার) পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করবেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। সকাল ১০টায় তিনি দক্ষিণ মেহেরনামায় ওয়াসিমের বাড়িতে পৌঁছে কবর জিয়ারত করবেন। পরে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করবেন এবং তাঁদের প্রতি সমবেদনা জানাবেন। একই দিনে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ওয়াসিমের শাহাদতস্থলে একটি স্মৃতিফলকের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করবেন তিনি।
প্রসঙ্গত, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের বাসিন্দা ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পেকুয়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।