মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের নয়াপাড়া চান্দাকাটা এলাকায় এক মা ও তার শিশুপুত্রের মরদেহ মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। রবিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরের দিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। নিহতরা হলেন ইসমত আরা (৩২) এবং তার ছেলে আবরারুল হক (৫)।
সূত্র জানিয়েছে, ঘটনাস্থলটি ইউনিয়নের মূল সড়ক থেকে ভেতরের দিকে, তুলনামূলক নির্জন একটি জায়গা। আশপাশে বসতঘর থাকলেও দুপুরের সময় মানুষের আনাগোনা কম থাকে। এলাকাবাসী প্রথমে মরদেহ দুটি পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মানসিক ভারসাম্যহীন ইসমত আরা প্রথমে তার ছেলেকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে পরে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু ঘটনাস্থলের আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এই দাবিকে ঘিরে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ইসমত আরার মাথায় গভীর ক্ষতের চিহ্ন ছিল এবং মাথা রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এটি ইট বা শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাতের মতো বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে শিশু আবরারের গলায় আঘাতের চিহ্ন ছিল, যা শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার ইঙ্গিত দেয়। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, যদি এটি আত্মহত্যা হয়, তবে একজন মানুষ কীভাবে নিজের মাথায় শক্ত বস্তু দিয়ে এমন আঘাত করে মৃত্যু ঘটাতে পারে? আবার মানসিকভাবে অসুস্থ হলেও একজন মা কি এমনভাবে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে? তাছাড়া কাছাকাছি বাড়িঘর থাকা সত্ত্বেও কেউ কোনো চিৎকার বা শব্দ শোনেনি, সেটিও ঘটনাটিকে আরও রহস্যজনক করে তুলছে।
নিহত ইসমত আরার পিতা আনচার উল্লাহ বলেন, তার মেয়ের সাথে একই ইউনিয়নের ঘটিভাংগা এলাকার রহিম উল্লাহ'র সাথে ইসলামী শরীয়াহ মতে বিয়ে হয়েছিলো। তবে মানসিক সমস্যা ও মৃগী রোগের কারণে ছয় বছর আগে তাদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে ইসমত আরা বাবার বাড়িতেই থাকতেন। তিনি দাবি করেন, মেয়েটি মাঝে মাঝেই খিঁচুনি ও জ্ঞান হারানোর সমস্যায় ভুগতেন। অনেক চিকিৎসা করিয়েও তেমন উন্নতি হয়নি।।তিনি আরও জানান, পাঁচ বছর আগে বাবার বাড়ির পুকুরে পড়ে ইসমত আরার বড় ছেলের মৃত্যু হয়েছিল। রবিবার হঠাৎ এলাকাবাসী এসে জানায়, তার মেয়ে ও নাতি মাটিতে পড়ে আছে। সেখানে গিয়ে তিনি দুজনকেই মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
তবে এই মৃত্যুকে সহজভাবে আত্মহত্যা বলে মানতে নারাজ নিহতের সাবেক স্বামী রহিম উল্লাহর পরিবার। রহিম উল্লাহর মা বলেন, তার নাতির এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানান।
মহেশখালী থানার ওসি মজিবুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পরিবারের বক্তব্য ও ঘটনাস্থলের আলামত দুটিই বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় পুরো নয়াপাড়া চান্দাকাটা এলাকায় শোক আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে একটি পরিবার আগেই একটি সন্তান হারিয়েছে, অন্যদিকে আবার মা ও দ্বিতীয় সন্তানের এমন মৃত্যু এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই মৃত্যু আত্মহত্যা না কি হত্যা, সে প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই। তবে ঘটনাস্থলের আলামত ও স্থানীয়দের বর্ণনা বলছে, এটি একটি সাধারণ পারিবারিক ট্র্যাজেডির চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং উদ্বেগজনক।