জসিম মাহমুদ ও গিয়াস উদ্দিন
টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপে নাফ নদীর তীরে নির্মিত ৫৫০ মিটার দীর্ঘ জেটিটি দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জেটির রেলিংসহ বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিন যাতায়াতকারী স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা দুর্ঘটনার শঙ্কায় রয়েছেন।
উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, সেন্টমার্টিনগামী পর্যটক, স্থানীয় জেলেদের নৌযান চলাচল এবং পশু করিডোরের সুবিধা বাড়াতে ২০০৪ সালে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে জেটিটি নির্মাণ করা হয়। এতে বিশ্রামাগার, শৌচাগার, চারটি সিঁড়ি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ২০০৪ সালে এটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। উদ্বোধনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জেটিটিতে আর কোনো সংস্কার কাজ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাবরাং ট্যুরিজম পার্কের জমি ভরাটের জন্য ‘মেসার্স চায়না হারবাল’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নাফ নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করে। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলায় জেটির পিলারের চারপাশের মাটি সরে গিয়ে কাঠামো দেবে যাচ্ছে। এর ফলে রেলিংসহ বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে এবং পুরো শাহপরীর দ্বীপ এলাকা ভাঙনঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেটির মূল কাঠামোর বিভিন্ন অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে গিয়েছে। জরাজীর্ণ বিশ্রামাগার ও শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী। এমন বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যেই জেটি দিয়ে পর্যটক ও স্থানীয়দের চলাফেরা করতে হচ্ছে। জেটির মুখে কোস্টগার্ড ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
নিরাপত্তায় নিয়োজিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিজিবি সদস্য জানান, ঝুঁকি এড়াতে জেটিতে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং লোকজনকে ভিড় না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জেটিটি ইজারা দিয়ে নিয়মিত টোল আদায় করা হচ্ছে। ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. ইউনুস জানান, বছরে সাড়ে ১৭ লাখ টাকায় জেটিটি ইজারা নেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি ১০ টাকা এবং মোটরসাইকেল প্রতি ৫০ টাকা হারে টোল আদায় করা হয়, যা থেকে দিনে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো ওঠে।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সালাম বলেন, 'জেটিতে পর্যটকদের আনাগোনার পাশাপাশি দৈনিক ৪০-৫০টি পরিবার বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। জেটিটি ধসে পড়লে পুরো দ্বীপবাসীর যোগাযোগ ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।'
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, জরাজীর্ণ জেটিটিতে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ যাতায়াত করছে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা প্রকৌশলী আলা উদ্দিন খাঁন বলেন, 'জেটিটি জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তাদেরই এটি দেখভালের দায়িত্ব। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এলজিইডির পক্ষ থেকে সরেজমিন পরিদর্শন করে সংস্কারের জন্য প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই অনুমোদন পাওয়ার আশা করছি।'
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, জেটি সংস্কারের বিষয়ে এলজিইডিকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। একটি প্রতিনিধি দল স্থানটি পরিদর্শন করেছে। ব্যয় নির্ধারণের পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, 'শাহপরীর দ্বীপের ঝুঁকিপূর্ণ জেটিটির বিষয়ে জেলা পরিষদকে অবহিত করা হয়েছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুততম সময়ে সংস্কার কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।'