বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা এবং তাদের জাতীয়তা নিয়ে মিয়ানমার যে বক্তব্য দিয়েছে, তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়ে-এর সঙ্গে বৈঠকে সরকারের এ অবস্থা তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান।
পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে তাদের আলোচেনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলা হয়, “এটাও বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা বাঙালি নয়। কেননা অতি সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের দ্বারাই তাদের নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়া গেছে।”
২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। সেই রোহিঙ্গা ঢলের নয় বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে রোববার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতি আসে।
সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ দাবি করে বলা হয়, ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠী মিয়ানমারে নেই।
মিয়ানমারের দাবি, বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
আর ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু করা হবে না বলেও বিবৃতিতে জানিয়েছে মিয়ানমার।
মিয়ানমারের ওই বিবৃতির কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সংখ্যাসহ বিবৃতিতে দেওয়া অনেক বিষয় ছিল ‘ভুল পরিসংখ্যান নির্ভর’। তাদের সঠিক সংখ্যার প্রতিফলন জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় তাদের নিবন্ধনের মধ্যেই রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দ্বিপক্ষীয় মতৈক্যের ওপর ভিত্তি করে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার কথা রাষ্ট্রদূতকে বলেছেন মহাপরিচালক। এক্ষেত্রে ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পরও বিভিন্ন সময়ে পালিয়ে আসা নবাগতদেরও বিষয়ে বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
“তাদের নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় আছে বাংলাদেশ এবং ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তথ্য যথা সময়ে মিয়ানমার সরকারকে দেওয়া হবে। ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে নতুন যোগ করা তথ্যাবলিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করেছেন মহাপরিচালক।”
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ রাজধানী নেপিদোতে জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত সোয়ে মোয়ে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবসন শুরু করার জন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়েও মিয়ানমার সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবসন যে এই সংকটের একমাত্র সমাধান, সে বিষয়ে ঢাকার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন মহাপরিচালক।
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “মিয়ানমারের দিক থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে সংখ্যার কিছু বিভ্রান্তি আছে। যেটার সাথে বাংলাদেশের সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একমত না।
“তো, উনাদের সাথে কথা হয়েছে…মিয়ানমার অ্যাম্বাসেডর আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন যে মিয়ানমার সরকারের সাথে উনি কথা বলবেন।”
মিয়ানমার সরকারের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ধীরগতির কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যেন আরও একটু দ্রুতগতিতে তারা ভেরিফিকেশন প্রসেসটা করে…।”
বাংলাদেশ যে মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছিল, সে কথাও রাষ্ট্রদূতকে মনে করিয়ে দেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমরা চাই যে তারা সুস্থভাবে, স্বাভাবিকভাবে একটা সেইফ অবস্থায় ফিরে যাক তাদের দেশে। তাদের একটা নিজেদের আইডেন্টিটি আছে, সেই আইডেন্টিটি নিয়েই তারা ফেরত যাবে।”
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে স্রোতের মত ঢুকতে শুরু করে রোহিঙ্গারা।
কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। যেখানে আগে থেকেই ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ। কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে এখন বসবাস করছে ১৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ওই বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় মিয়ানমারের অং সান সু চির সরকার। ওই বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতেও তারা সই করে।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার একপর্যায়ে ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা রাখতে পারেনি রোহিঙ্গারা, ফলে ভেস্তে যায় আলোচনা।
এরপর আসে কোভিড মহামারী; রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগেও ঢিল পড়ে। বিশ্বজুড়ে সেই সংকটের মধ্যেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চির সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন সামরিক জান্তা জেনারেল মিন অং হ্লাইং। তাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আসে নতুন ধাক্কা।
এর মধ্যে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে যায়।