আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবির ভয়াবহতা থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও স্বস্তিতে নেই কক্সবাজারের উখিয়ার ক্যাম্প-৬, এ-৫ ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (২৭)। মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশের পর থেকেই তিনি হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, দালালচক্র তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে, ফলে তিনি গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে রফিকুল ইসলাম বলেন, তারা যে ট্রলারে করে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন, সেই ট্রলারের মালিক ছিলেন ছৈয়দ মাঝি। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
রফিকুল ইসলাম আরও জানান, ছৈয়দ মাঝির বড় ভাই মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত এবং তারও একাধিক ট্রলার রয়েছে। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘নানা মাঝি’ নামে পরিচিত।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, রোববার বিকেল ৩টার পর নানা মাঝি তার মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তাকে গালিগালাজ ও বকাঝকা করেন। পাশাপাশি তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে তাকে ক্যাম্প থেকে তুলে নেওয়া হবে। এ সময় তিনি দাবি করেন, ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে নানা মাঝির লোকজন রয়েছে।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মিনিট ধরে চলা সেই কলের পর তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে ফোন কেটে দিতে বাধ্য হন। তিনি আরও দাবি করেন, নানা মাঝি মালয়েশিয়ায় মানবপাচার চক্রের একজন প্রভাবশালী দালাল হিসেবে পরিচিত।
এদিকে গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী ১টি ট্রলারে ছিলেন প্রায় ২৮০ জন যাত্রী-স্থানীয় ও রোহিঙ্গা নাগরিক। মাঝসমুদ্রে খাবার ও পানির সংকট নিয়ে হৈ-চৈ, যার পরিণতি ট্রলারে ৪টি গোপন কক্ষে আটকে রেখে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ট্রলারটি উল্টে গিয়ে আরও বহু যাত্রীর সলিল সমাধির আশঙ্কা তৈরি হয়। বেঁচে ফেরা রফিকুল ইসলাম জবানবন্দিতে উঠে এসেছে মানবপাচার চক্রের ভয়াবহ চিত্র।
ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্যাম্পের এক পরিচিত যুবক তাকে টেকনাফ বন্দরে কাজের প্রলোভন দেখায়। ৬০০ টাকা মজুরির আশ্বাসে ২ এপ্রিল বিকেলে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে টেকনাফে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে নিয়ে তাকে একটি গুদামঘরে আটকে রাখা হয়। কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে দালালরা তাকে মারধর করত। দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হতো।
তিনি বলেন, তাদেরকে টেকনাফের রাজারছড়া গ্রামের ভেতরে রাখা হয়েছিল। পরে রাতে বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে বিজিবি ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে ১০-২০ জন করে ছোট ট্রলারে তুলে সাগরের চামেলী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বড় ট্রলারে রাত ৯টার দিকে তোলা হয় এবং সব যাত্রী ওঠার পর রাত ১২টায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়।
রফিকুল জানান, ট্রলারে মোট প্রায় ২৮০ জন ছিল-পুরুষ ২৪০ জন, নারী ২০ জন, শিশু ৪ জন এবং স্টাফ ১৩ জন। খাবার ও পানির সংকট ছিল চরম। দিনে মাত্র দুবার অল্প খাবার দেওয়া হতো এবং পানি দেওয়া হতো খুবই সীমিত। কেউ পানি চাইলে বা হৈচৈ করলে দালালরা তাদের ট্রলারের নিচে মাছ বা বরফ রাখার গোপন কক্ষের মধ্যে ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দিত।
তিনি বলেন, ট্রলারে এমন চারটি গোপন কক্ষ ছিল। প্রতিটিতে সাধারণত ২০-২৫ জন রাখা সম্ভব হলেও, ঘটনার দিন একেকটিতে প্রায় ৪০ জন করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ৭ এপ্রিল রাত ২টার দিকে পানির জন্য প্রতিবাদ করলে তাদের গোপন কক্ষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে শ্বাস নিতে না পেরে অনেকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তিনটি গোপন কক্ষ খুলে ৩৩ জনকে মৃত অবস্থায় বের করে সাগরে ফেলে দেওয়া সিদ্ধান্ত নেয় দালালরা।
এর আধা ঘন্টা পর আন্দামান সাগরের কাছে পৌঁছানোর পর ট্রলারটি কয়েকবার ঢেউয়ের ধাক্কা খেয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। একপর্যায়ে একটি বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি উল্টে যায়। রফিকুল জানান, ট্রলারের একটি অংশ কিছুক্ষণ ভাসমান ছিল এবং তিনি প্রায় এক ঘণ্টা সেটি ধরে ছিলেন। পরে সেটিও ডুবে গেলে তিনি সাগরে ভেসে থাকতে থাকেন।
তিনি বলেন, চারদিকে ভাসমান অবস্থায় মৃতদেহ দেখতে পান, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের। প্রায় দুই দিন এক রাত সাগরে ভেসে থাকার পর বেঁচে থাকা প্রায় ৫০ জনও ঢেউয়ের কারণে ছড়িয়ে পড়ে। পরে চারজন একত্র হলে একটি জাহাজকে সংকেত দিয়ে সাহায্য চান। জাহাজটি তাদের উদ্ধার করে এবং আরও পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করে। পরে মোট ৯ জনকে সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রফিকুল আরও জানান, অজ্ঞান অবস্থায় তাকে ট্রলারের গোপন কক্ষ থেকে তুলে ইঞ্জিনের পাশে রাখা হয়। জ্ঞান ফেরার পরও তাকে সেখানে শুইয়ে রাখা হয়। ট্রলার ডুবে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনের তেল তার শরীরে পড়ে, এতে শরীর জ্বলে যায়। পরে নোনা পানিতে পড়লে সেই জ্বালা আরও বেড়ে যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, ট্রলারে কেউ পানি খুঁজলে বা নড়াচড়া করলে দালালরা নির্মমভাবে মারধর করত। তাকে কোমরে আঘাত করা হয়েছে, বেল্ট ও কাঠের টুকরো দিয়েও পেটানো হয়েছে। একইভাবে অন্যদেরও নির্যাতন করা হয়েছে।
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ৮ এপ্রিল ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। পরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড, যাদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ ও ১ জন নারী রয়েছেন। ১১ এপ্রিল তাদের পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।
অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবু সালেহ মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, এ ধরনের হুমকির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কেউ যদি সত্যিই দালালচক্রের কাছ থেকে হত্যার হুমকির মুখে পড়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি দ্রুত ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএন ও সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প ইনচার্জকে অবহিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এ বিষয়ে উখিয়াস্থ ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ককে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।