মহেশখালীর শাপলাপুরে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণ নিয়ে তৈরি হয়েছে উন্নয়ন বনাম পরিবেশের সংঘাত। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার সড়কটি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করতে চাইলেও শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বন বিভাগ। এরই মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর সড়ক নির্মাণ কার্যক্রমের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আদালতের আদেশের পরও সংশ্লিষ্ট এলাকায় সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। সর্বশেষ শুক্রবার বিকালেও সেখানে কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বনভিাগের স্থানীয় কর্মকর্তা।
স্থানীয়রা জানান, মহেশখালীর শাপলাপুর ইউনিয়নের জেএম ঘাট থেকে শুরু হয়ে কালারমারছড়ায় গিয়ে মিশেছে প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পথ। পাহাড়ের ওপর দিয়ে আঁকাবাঁকা এই পথের দুই পাশে রয়েছে ঘন বন। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত পথটিকে পাকা সড়কে রূপ দিতে উদ্যোগ নেয় এলজিইডি।
এলজিইডির মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি জানান, এটি এলজিইডির গেজেটভুক্ত রাস্তা। জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শুরু হওয়ার পর কিছু সমতল অংশে ঢালাই ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও এগিয়েছে। তবে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণ নিয়ে শুরু থেকেই বন বিভাগের আপত্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
উপকূলীয় বন বিভাগের কক্সবাজারের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ জানান, মহেশখালীর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর বনভূমি ১৯৫৭ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সংরক্ষিত এ বনভূমি বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ।
বন বিভাগের ভাষ্য, সংরক্ষিত বনে বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। সেখানে গাছ কাটা, বনভূমির অবৈধ ব্যবহার কিংবা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শেখ আবুল কালাম আজাদ বলেন, পাহাড়ের ওপর দিয়ে মানুষের পায়ে হাঁটার পথ থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে পাকা সড়কে রূপ দেওয়ার সুযোগ নেই। এলজিইডি রাস্তার কাজ বন্ধ না করলে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এই বন শুধু গাছপালার আবাসস্থল নয়; হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। পাকা সড়ক নির্মাণ হলে বন উজাড়, অবৈধ দখল এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়বে।
বন বিভাগের দাবি, সংরক্ষিত বনের ভেতর এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন থাকা জরুরি। কিন্তু এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সে ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
আর সড়ক নির্মাণ নিয়ে বিরোধ গড়ায় আদালত পর্যন্ত। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) জনস্বার্থে মামলা করলে প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ গত ৬ আগস্ট সংরক্ষিত বনভূমির ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণসংক্রান্ত সব কার্যক্রমের ওপর দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা দেন।
আদালত একই সঙ্গে রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ কেন আইনবহির্ভূত, আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করা হবে না।
প্রকল্পটির আওতায় সংরক্ষিত বনের ভেতর প্রস্তাবিত ৩ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ বাতিল, ইতোমধ্যে নির্মিত সড়কের পাকা অংশ অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
আদালতের আদেশে আরও উঠে এসেছে, ১২ নম্বর পাহাড় মৌজার ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর বনভূমি ১৯৫৭ সালের গেজেটের মাধ্যমে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়া সেখানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারির পরও সড়কের কিছু অংশে নির্মাণকাজের তৎপরতা দেখা গেছে। শুক্রবার বিকালেও সেখানে কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
মহেশখালীর সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে শুক্রবার বিকালেও সড়কে ঢালাই করার কাজ হয়েছে। বনবিভাগ গিয়ে নিষেধ করলে কিছুক্ষণ বন্ধ রাখলেও পরে নির্মাণ কাজ করেছেন। বিষয়টি উর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮ টায় এলজিইডির মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনিকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।