চকরিয়া উপজেলার নবগঠিত পহরচাঁদা ইউনিয়নে রেলসেতু ও সড়ক ঘেঁষে চলছে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্রগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
যে কোনো মুহূর্তে রেলসেতুটি ধসে পড়ে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সাথে সারাদেশে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
জানা গেছে, পহরচাঁদা ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া এলাকায় রেলসেতু ও সড়ককে ঢাল বানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বালুর অবৈধ মহাল ও বিশাল ডিপু পরিচালনা করছে একটি চক্র। স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, মিনহাজ উদ্দিন ও কবির আহমেদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত। কোনো ধরণের সরকারি অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র কিংবা জেলা প্রশাসনের ইজারা ছাড়াই তারা রেলসেতুর মূল অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা বাঁধের একদম কোল ঘেঁষে শক্তিশালী শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। রেললাইনের পিলারের গোড়া থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ব্রিজের মূল কাঠামোর নিচের মাটি সরে গিয়ে গভীর ও বিপজ্জনক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে শত শত টন ওজনের রেল চলাচলের যে কম্পন ও চাপ নেওয়ার ক্ষমতা সেতুটির থাকে, তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বালু উত্তোলনের কারণে সেতুর গাইড ওয়ালগুলো ইতিমধ্যে ভারসাম্য হারাতে শুরু করেছে এবং পিলারের গোড়া উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, যা পুরো রেল যোগাযোগ কাঠামোকে গোড়া থেকে সম্পূর্ণ নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে পহরচাঁদা সংলগ্ন ছড়া ও মাতামুহুরী নদীর শাখাগুলোর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। নদীর তলদেশ গভীর হওয়ায় পানির স্রোত সরাসরি আঘাত হানছে প্রতিরক্ষা বাঁধ ও রেলসেতুর মূল পিলারে।
সচেতন মহল মনে করছেন, এই বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে পুরো সেতুটি ধসে পড়তে পারে। তখন শুধু রেল যোগাযোগ বন্ধ হবে না, নদীর গতিপথ বদলে পুরো পহরচাঁদা ইউনিয়নই বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বালু পাচারের কোনো সময়সূচি নেই।
গভীর রাত ২৪ ঘণ্টাই অবিরাম চলছে এই বালু পাচার উৎসব। দিন-রাত সমানতালে শতশত মিনি ট্রাক ও ডাম্পার ভর্তি করে বালু পাচার করা হচ্ছে চকরিয়াসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। তীব্র শব্দে শ্যালো মেশিন চলার কারণে যেমন শব্দ দূষণ হচ্ছে, তেমনি বালু ভর্তি ভারি যানবাহন চলার কারণে গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়কগুলো ধসে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে যখন সাধারণ মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন ডাম্পার ট্রাকের তীব্র হর্ন ও বিকট শব্দে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত বালু বহনের কারণে গ্রামীণ রাস্তাগুলোর পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের চলাচলের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তি ডেকে এনেছে।
তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা মোর্শেদ আলম বলেন, মিনহাজ ও কবির দিনরাত শ্যালো মেশিন বসিয়ে সেতুর গোড়া থেকে বালু তুলছে। এতে রেলসেতুটি যেমন ঝুঁকিতে পড়েছে তেমনি আমাদের ঘরবাড়ি ও চাষের জমিও বিলিন হবে। অসংখ্য ডাম্পার চলাচল করায় সরকারি রাস্তাটি ভেঙ্গে গিয়েছে। তিনি এই অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রশাসন প্রতি আকুল আবেদন করেন।
বালু বাণিজ্যের মূল অভিযুক্ত মিনহাজ উদ্দিন বলেন, আমি বৈধ বালু ইজাদার নই। তবে বালু উত্তোলনের ফলে রেলসেতু ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ আমাদের দ্বারা হচ্ছে।
চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিউল আলম বলেন, পহরচাঁদা ইউনিয়নে রেলসেতুর নিচ থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।