ফোন ভাঁজ করলেই ছোট, খুললেই বড় পর্দা—এবার বাজারে মিলছে অ্যাপলের ফোল্ডেবল আইফোন। iPhone Duo নামের এই ফোনে বড় ডিসপ্লে, শক্তিশালী প্রসেসর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নানা সুবিধার কথা তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে নজর কাড়ছে ফোনটির দামও। কী কী সুবিধা থাকছে এই ফোনে, আর কেনই বা এর দাম এত বেশি—জেনে নেওয়া যাক বিস্তারিত।
১. নকশা ও ডিসপ্লে
প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন: iPhone Duo অ্যাপলের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন।
বড় ডিসপ্লে: অ্যাপলের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুসরণে ফোনটি খুললে ৭.৬ ইঞ্চির Super Retina XDR ডিসপ্লে পাওয়া যাবে।
বড় পর্দার সুবিধা: অ্যাপলের দাবি, খোলা অবস্থায় এর ডিসপ্লে iPhone 18 Pro Max-এর চেয়ে ৫০ শতাংশ বড়।
বাইরের ডিসপ্লে: ফোন ভাঁজ করা অবস্থায়ও ব্যবহার করা যাবে। বাইরের পর্দার ক্ষেত্রফল iPhone 18 Pro-এর ডিসপ্লের ৯০ শতাংশের বেশি বলে জানিয়েছে অ্যাপল।
পাতলা নকশা: আইফোনগুলোর মধ্যে এটি খোলা অবস্থায় সবচেয়ে পাতলা।
উন্নত ডিসপ্লে প্রযুক্তি: ভেতরের পর্দায় ১০টির বেশি অতি পাতলা স্তর এবং বিশেষ ন্যানো-টেক্সচার ফিনিশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা আলোর প্রতিফলন কমাতে সাহায্য করে।
উজ্জ্বলতা: ডিসপ্লের সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা ৩ হাজার নিট।
ডিসপ্লের নিচে ক্যামেরা: ভেতরের পর্দার FaceTime ক্যামেরা ডিসপ্লের নিচে রাখা হয়েছে। ফলে ক্যামেরা ব্যবহার না করলে পর্দায় সেটি দৃশ্যমান থাকে না।
রং: অ্যাপলের ওয়েবসাইটে দুটি রঙ দেখানো হয়েছেন— Night Sky ও Star White.
২. ভাঁজ করার ধরন ও ব্যবহারের সুবিধা
ফোনটি বিভিন্ন অবস্থানে ব্যবহার করা যাবে।
ল্যান্ডস্কেপ মোড: ফোনটি আড়াআড়ি খুলে সিনেমা, ভিডিও ও গেম উপভোগ করা যাবে। একই সঙ্গে দুটি অ্যাপ পাশাপাশি চালানো যাবে।
পোর্ট্রেট মোড: লম্বালম্বি অবস্থানে বড় পর্দায় ব্রাউজিং, স্ক্রলিং ও টাইপিং করা যাবে। ভিডিও ওপরের দিকে রেখে অন্য অ্যাপও ব্যবহার করা যাবে।
ভাঁজ করা অবস্থায়: বাইরের পর্দায় ফোন ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পাশে থাকায় এক হাতে সহজে ব্যবহার করা যাবে।
নিজে থেকে দাঁড়ানোর সুবিধা: ফোনটি নির্দিষ্ট কোণে রেখে ভিডিও দেখা, FaceTime কল করা ও ভিডিও ধারণ করা যাবে।
StandBy: ফোনটিকে ঘড়ি, ছবির ফ্রেম, আবহাওয়ার তথ্য, ক্যালেন্ডার কিংবা বিভিন্ন উইজেট প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা যাবে।
দুটি অ্যাপ একসঙ্গে: এক পাশে ছবির সংগ্রহ খুলে অন্য পাশে Mail অ্যাপে ছবি টেনে নেওয়ার মতো কাজ করা যাবে।
Apple Pencil সমর্থন: USB-C সংযোগযুক্ত Apple Pencil-এর সঙ্গে ব্যবহার করার সুবিধা আছে।
৩. স্থায়িত্ব ও সুরক্ষা
টাইটানিয়াম কাঠামো: ফ্রেম ও হিঞ্জের বাইরের অংশে Grade 5 titanium ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
ভেতরের পর্দার সুরক্ষা: ডিসপ্লেতে আঁচড় প্রতিরোধী বিশেষ আবরণ রয়েছে।
সামনে ও পেছনে সুরক্ষা: দুই পাশেই Ceramic Shield ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছে অ্যাপল।
পানি ও ধুলা প্রতিরোধ: ফোনটিতে IP68 রেটিং রয়েছে বলে দাবি করেছে অ্যাপল।
৪. ক্যামেরা
৪৮ মেগাপিক্সেলের ডুয়াল ক্যামেরা: পেছনে দুটি ক্যামেরা রয়েছে—৪৮ মেগাপিক্সেলের Fusion Main এবং ৪৮ মেগাপিক্সেলের Fusion Ultra Wide।
১২ মেগাপিক্সেলের সামনের ক্যামেরা: সেলফি ও ভিডিও কলের জন্য Center Stage প্রযুক্তিসহ ফ্রন্ট ক্যামেরা রয়েছে।
৪কে ভিডিও: সর্বোচ্চ ১২০ ফ্রেম প্রতি সেকেন্ডে ৪কে ভিডিও ধারণের সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
Smart Take: ক্যামেরা বুঝতে পারবে কখন সবাই ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত। ফলে টাইমার চালু করে দৌড়ে ফ্রেমে ঢোকার প্রয়োজন কমবে।
Duo Preview: বাইরের পর্দায় ছবি তোলার বিষয়টি সরাসরি দেখা যাবে। ফলে ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তি নিজের অবস্থান ও ছবির ফ্রেম ঠিক করে নিতে পারবেন।
Kid Cue: বাইরের পর্দায় মজার অ্যানিমেশন দেখিয়ে শিশুদের ক্যামেরার দিকে তাকাতে উৎসাহিত করা যাবে।
Duo FaceTime: আশপাশের অন্য ব্যক্তিরাও বাইরের পর্দায় নিজেদের যুক্ত করে ভিডিও কলে অংশ নিতে পারবেন।
AI-নির্ভর ছবি সম্পাদনা: Spatial Reframing দিয়ে ছবির বিন্যাস পরিবর্তন, Extend দিয়ে ছবির পরিসর বাড়ানো এবং Clean Up দিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তু সরানোর সুবিধা রয়েছে।
কম আলোতে ভিডিও: ডিফল্ট ১০৮০পি সেটিংয়ে কম আলোতেও ভিডিও ধারণের সুবিধা উল্লেখ করা হয়েছে।
Cinematic Mode: ভিডিও ধারণের পরও বিষয়বস্তুর পেছনের অংশ ঝাপসা করার মতো ডেপথ-অব-ফিল্ড প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
৪কে টাইম-ল্যাপস: Dolby Vision HDR-সহ ৪কে রেজল্যুশনে টাইম-ল্যাপস ভিডিও করা যাবে।
Smart Focus Tracking: কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর গতিবিধি অনুসরণ করে ফোকাস ধরে রাখতে পারবে ক্যামেরা।
৫. প্রসেসর ও পারফরম্যান্স
A20 Pro চিপ: ফোনটিতে Apple A20 Pro প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে।
১৬-কোর Neural Engine: দুটি ১৬-কোর Neural Engine-সহ চিপটি জটিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজ পরিচালনার জন্য তৈরি।
উন্নত CPU: অ্যাপলের দাবি, A19 Pro-এর তুলনায় ৬-কোর CPU সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দ্রুত।
মেমোরি ব্যান্ডউইথ: আগের A19 Pro-এর তুলনায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বেশি মেমোরি ব্যান্ডউইথ পাওয়া যাবে।
ভ্যাপার চেম্বার কুলিং: উন্নত তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভারী কাজ ও দীর্ঘ সময় গেম খেলার সময় পারফরম্যান্স ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
গেমিং ও AI: বড় ডিসপ্লে এবং উন্নত প্রসেসর একসঙ্গে ব্যবহার করে গেমিং, ছবি সম্পাদনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কাজের অভিজ্ঞতা উন্নত করা হয়েছে।
৬. ব্যাটারি ও চার্জিং
ডুয়াল ব্যাটারি: আইফোনে প্রথমবারের মতো দ্বৈত ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে।
দীর্ঘ ব্যাকআপ: একবার চার্জে সারাদিন ব্যবহারের উপযোগী ব্যাটারি পারফরম্যান্সের দেবে বলে দাবি করেছে অ্যাপল।
ভিডিও চালানোর সময়: ভেতরের ডিসপ্লে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৩১ ঘণ্টা এবং বাইরের ডিসপ্লে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৪৪ ঘণ্টা ভিডিও চালানো যাবে।
দ্রুত চার্জিং: তারযুক্ত দ্রুত চার্জারে প্রায় ২০ মিনিটে ব্যাটারির চার্জ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া যাবে।
MagSafe: MagSafe ওয়্যারলেস চার্জিং সমর্থন রয়েছে।
Qi2 চার্জিং: ২৫ ওয়াটের Qi2 ওয়্যারলেস চার্জার এবং উপযুক্ত Qi-সনদপ্রাপ্ত চার্জার ব্যবহার করা যাবে।
eSIM নকশা: প্রচলিত সিম কার্ডের স্লট না থাকায় ফোনের ভেতরে ব্যাটারির জন্য বেশি জায়গা রাখা সম্ভব হয়েছে বলে অ্যাপল জানিয়েছে।
৭. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও Siri AI
অ্যাপলের ওয়েবপেজে iPhone Duo-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে Siri AI ও Apple Intelligence-এর কথা বলা হয়েছে।
কথোপকথনভিত্তিক সহকারী: Siri AI-কে প্রশ্ন করা, ধারণা তৈরি, কাজের পরিকল্পনা এবং সৃজনশীল কাজে সহায়তা নেওয়া যাবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বুঝতে পারা: ফোনে সংরক্ষিত পুরোনো ছবি, ইমেইল বা নোট খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।
অ্যাপের মধ্যে কাজ: Messages, Music ও Reminders-এর মতো অ্যাপে নির্দেশ দিয়ে বিভিন্ন কাজ করা যাবে।
অনলাইন তথ্য: বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করে অনলাইনের তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর ও পরামর্শ নেওয়া যাবে।
৮. অপারেটিং সিস্টেম ও মাল্টিটাস্কিং
iOS 27: ফোনটিতে iOS 27-এর নতুন অভিজ্ঞতা দেবে।
Split View: বড় পর্দায় পাশাপাশি দুটি অ্যাপ চালানো যাবে।
ডিসপ্লে পরিবর্তন: ফোন ভাঁজ করা বা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের ও ভেতরের পর্দার ব্যবহার উপযোগীভাবে পরিবর্তিত হবে।
ভিডিও ও অন্যান্য কাজ: এক পর্দায় ভিডিও চালিয়ে অন্য পর্দায় কাজ করার সুবিধা রয়েছে।
StandBy: ফোন না চার্জ দিয়েও ঘড়ি, ছবি, আবহাওয়া, ক্যালেন্ডার ও উইজেট দেখানোর সুবিধা আছে।
৯. নেটওয়ার্ক ও সংযোগ
শুধু eSIM: ফোনটিতে ফিজিক্যাল সিম কার্ড ব্যবহার করা যাবে না। বিশ্বব্যাপী eSIM-নির্ভর নকশার কথা বলা হয়েছে।
স্যাটেলাইটে জরুরি সহায়তা: নেটওয়ার্ক ও Wi-Fi না থাকলে জরুরি পরিষেবায় যোগাযোগের সুবিধার কথা বলা হয়েছে। তবে এর ব্যবহার দেশ ও অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
গাড়ি দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ: সেন্সর ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করে গুরুতর দুর্ঘটনা শনাক্ত এবং প্রয়োজন হলে সহায়তা চাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
১০. স্টোরেজ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা
স্টোরেজ: ২৫৬ জিবি, ৫১২ জিবি, ১ টেরাবাইট ও ২ টেরাবাইট—চারটি ধারণক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
Touch ID: পাশের বোতামে যুক্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের মাধ্যমে ফোন আনলক করা যাবে। ওয়েবপেজে Face ID-এর পরিবর্তে Touch ID ব্যবহার করা যাবে।
১৩. দাম ও কোথায় পাওয়া যাবে?
অ্যাপলের ওয়েবপেজে জানানো হয়েছে, iPhone Duo তাদের ওয়েবসাইট, নির্দিষ্ট মোবাইল অপারেটর এবং অংশীদার বিক্রেতাদের কাছে পাওয়া যাবে। পুরোনো যোগ্য ডিভাইস জমা দিয়ে নতুন ফোন কেনার ক্ষেত্রে ট্রেড-ইন সুবিধার কথাও বলা হয়েছ।
যুক্তরাষ্ট্রে এই ফোনের অফিসিয়াল মূল্য (কর ব্যতীত):
256 GB (বেস মডেল): ১,৯৯৯ ডলার
512 GB: ২,১৯৯ ডলার
1 TB: ২,৪৯৯ ডলার
2 TB: ২,৯৯৯ ডলার
২৩ অক্টোবরের তথ্য অনুযাযী, ভারতে বিভিন্ন স্টোরেজ ভ্যারিয়েন্টের অফিসিয়াল দাম নিচে দেওয়া হলো-
256 GB:২,৯৯,৯০০ রুপি।
512 GB: ৩,২৪,৯০০ রুপি।
1 TB: ৩,৭৪,৯০০ রুপি।
2 TB: ৪,৪৯,৯০০ রুপি।
বাংলাদেশে এখনও অ্যাপলের অফিশিয়াল কোনো স্টোর না থাকায় বিভিন্ন শপ আনঅফিশিয়ালি ডিভাইসটি আমদানি করে বিক্রি করছে। দোকান ও ভ্যারিয়েন্ট ভেদে এর দামের কিছু তারতম্য রয়েছে।
বাংলাদেশে আইফোন ডুও বেস ভেরিয়েন্টের মূল্য রাখা হচ্ছে প্রায় ৩,৪০,০০০ টাকা থেকে ৩,৯০,০০০ টাকা পর্যন্ত।