সাগরের সেই উত্তাল রূপ নেই। নেই ঢেউয়ের তাণ্ডব। নীল জলরাশিতে এখন শান্ত ঢেউয়ের দোলাচল। সৈকতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পর্যটকেরা। কেউ নেমেছেন সাগরের পানিতে, কেউ ব্যস্ত ছবি তুলতে। পর্যটকদের পদচারণে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে।
পর্যটকদের এই আনাগোনায় ব্যস্ততা বেড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশার মানুষের। ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক ও জেট স্কি চালক, ঘোড়াওয়ালা থেকে শুরু করে সৈকতে চেয়ার-ছাতা ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের কর্মচাঞ্চল্যও বেড়েছে। তবে সাগর শান্ত থাকলেও সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে পর্যটকদের সতর্ক করছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে সমুদ্রের কাছে আসতে পেরে তাঁরা আনন্দিত। কারও কাছে এটি পরিবারের সঙ্গে অবসর কাটানোর সুযোগ, কারও কাছে আবার প্রথমবারের মতো সমুদ্র দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা থেকে বেড়াতে আসা হাবিব-রুমানা দম্পতি বলেন, ‘ব্যস্ত জীবনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসা মানসিক প্রশান্তির জন্য খুবই জরুরি। কক্সবাজারে এসে আমাদের খুব ভালো লাগছে। এখানকার পরিবেশ উপভোগ করছি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে সময় কাটাতে পেরে আমরা আনন্দিত।’
সিলেট থেকে শিক্ষা সফরে আসা পর্যটক রাফি বলেন, ‘আমরা সিলেট থেকে কক্সবাজারে এসেছি। প্রায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে সমুদ্রসৈকতে এসে সাগরের ঢেউ দেখে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে। এখানে এসে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। সবাই মিলে আনন্দ করছি, ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
নেপাল থেকে সিলেটের নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়তে আসা শিক্ষার্থী রিদিমার কাছে কক্সবাজার ভ্রমণ আরও বিশেষ কিছু। তিনি বলেন, ‘আমাদের কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের উদ্যোগে শিক্ষা সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে আসা। এটি আমার জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখা এবং প্রথমবারের মতো সমুদ্রসৈকতে আসার অভিজ্ঞতা। প্রথমবার সমুদ্রের পানিতে নামতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। এই ভ্রমণ আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
গাজীপুর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন রাবেয়া রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবারের সবাই মিলে কক্সবাজারে এসেছি। এখানে এসে খুব আনন্দ লাগছে। মাত্রই পৌঁছেছি। এখন সমুদ্রে গোসল করব, এরপর সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরব। সব মিলিয়ে ভালো সময় কাটানোর আশা করছি।’
পর্যটক বাড়ায় বেড়েছে কর্মব্যস্ততা
পর্যটকদের আগমনে সৈকতকেন্দ্রিক বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের পরিমাণও বাড়ছে। কেউ পর্যটকদের ছবি তুলে দিচ্ছেন, কেউ বিচ বাইকে ঘোরাচ্ছেন, আবার কেউ জেট স্কিতে সমুদ্রে ঘোরার সুযোগ করে দিচ্ছেন। সৈকতে চেয়ার-ছাতা ভাড়ার ব্যবসাতেও রয়েছে ব্যস্ততা।
সুগন্ধা পয়েন্টের ফটোগ্রাফার রহিম উদ্দিন বলেন, ‘কক্সবাজারে পর্যটকদের উপস্থিতি মোটামুটি ভালো। আজ থেকে পর্যটকদের আনাগোনা কিছুটা বেড়েছে। সামনে টানা সাত দিনের ছুটি থাকায় পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছি। পর্যটক বাড়ায় আমাদের কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে, আয়-রোজগারও ভালো হচ্ছে।’
জেট স্কি চালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘শীতের মৌসুম সামনে রেখে চলতি মাস থেকেই পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করেছে। এতে জেট স্কি চালানোর পাশাপাশি সৈকতের অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও ব্যস্ততা বেড়েছে। পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ায় আমাদের ব্যবসা মোটামুটি ভালো হচ্ছে। সামনে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়লে ব্যবসা ভালো হবে বলে আশা করছি।’
শান্ত সাগরেও সতর্কতা জরুরি
সাগরের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত হলেও সৈকতের কিছু স্থানে গুপ্ত গর্ত থাকায় পর্যটকদের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তায় লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করছেন লাইফগার্ড কর্মীরা।
সি-সেফ লাইফগার্ড সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে সমুদ্রের পরিস্থিতি বেশ ভালো। তবে সৈকতের কিছু স্থানে এখনো গুপ্ত গর্ত রয়েছে। এসব জায়গায় গোসল করতে নামলে পর্যটকেরা বিপদে পড়তে পারেন। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী-এই তিনটি পয়েন্টে আমরা কাজ করছি। আল্লাহর রহমতে আজ সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেনি। পর্যটকদের সব সময় লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে সমুদ্রে নামতে হবে। যেসব স্থানে লাল পতাকা রয়েছে, সেসব এলাকায় নামা থেকে বিরত থাকতে হবে। সমুদ্রে নামার আগে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।’
সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের আগ্রহের কমতি নেই। তবে আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। লাইফগার্ড কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলার মধ্য দিয়েই নিরাপদ হতে পারে কক্সবাজার ভ্রমণ।