জনজীবন অতিষ্ঠ, বিদ্যুৎ সংকট যেন পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে টেকনাফের। দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং, জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ সরবরাহ সব মিলিয়ে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের নীরব বিপর্যয়।
এর মধ্যেই চলাচল করা হাজার হাজার টমটমের ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিদিন বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। এতে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্র ও তথ্যানুযায়ী, টেকনাফ উপজেলায় গ্রাহক সংখ্যা ৭৭হাজার ২১৯। দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৩৫ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২-২৩ মেগাওয়াট। এসব লাইন পরিচালনার জন্য রয়েছে ৩৩/১১ লাইনে ১৮টি ফিডার।
পল্লী বিদ্যুতের এজিএম মহিন উদ্দিন বলেন, বর্তমানে লোডশেডিং নেই বলে তিনি অস্বীকার করলেন। তবে কক্সবাজার থেকে যে দুটি ৩৩কেভি সার্কিটের মাধ্যমে টেকনাফ উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা লাইন দুটি অত্যান্ত দীর্ঘ হওয়ায় (প্রায় ৯০ কিলোমিটার) আন্ডার ভোল্টেজ এবং ওভারলোড এর কারণে প্রায় ৮ মেগাওয়াট লোড ফোর্স সেডিং এর মাধ্যমে লোড ম্যানেজম্যান্ট করা হচ্ছে। তবে তিনি টমটমের চার্জিং নিয়ে কোন ধরনের কিছু বলতে রাজি হননি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দেশের মধ্যে ধনী, গরীব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের বসবাস করেন। বিদ্যুৎ বিল নিয়ে মানুষের মনে নানান ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিল পরিষদের সময় দেখা যায়, প্রথম দফা থেকে ষষ্ঠ দফা পর্যন্ত বিভিন্ন রেটে বিদ্যুৎ বিল হচ্ছে। বাংলাদেশে অন্য কোন সংস্থায় এমন কোন বিল বা রেওয়াজ রয়েছে কিনা। এই প্রথা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার প্রয়োজন। একটি বিলের মধ্যে বিভিন্ন রেটে বিদ্যুৎ বিল নেওয়া হচ্ছে। এটা কি উদ্দেশ্যে এবং কার ছাড়তে নেওয়া হচ্ছে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যুতের সমস্যা কারণ নিরসনের জন্য উপজেলায় ১৮টি ফিডারে ভাগ করা হয়েছে। এই ১৮টি ফিডারে সমানভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন রাত একটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। একই অভিযোগ রয়েছে বিদ্যুৎ বিলের উপর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন,‘জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি সৌর বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, সেটিও পুরোপুরি বাতাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দিনের পিক আওয়ারে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
টানা লোডশেডিংয়ে স্থবির জনজীবন-
এলাকায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। উপজেলার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অনেক জায়গায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎহীনতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উপজেলার ৭৭হাজার ২১৯জন গ্রাহক ।
নতুন পল্লানপাড়ার গৃহিনী আমিনা বেগম বলেন, ‘দিনের বেলায় গরমে থাকা যায় না। আবার রাতেও অন্ধকারে কাটাতে হয়। ঘনঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় ফ্রিজ, টিভিসহ অনেক জিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
লেঙ্গুরবিল রোডে বাসিন্দা আব্দুল আলী অভিযোগ করেন,‘বিদ্যুৎ বিতরণে বৈষম্য রয়েছে। কিছু ভবনে অবৈধভাবে দ্বৈত সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। পাশের বাড়িতে বিদ্যুৎ জ্বললেও অপর বাড়িতে বিদ্যুতের কোন লাইট জ্বলছে না। মাস শেষে বিল দিতে হয় বিশাল অংকের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংকটের মধ্যেই টেকনাফে ৯হাজার ৬৫০টি টমটম ও ইজিবাইক প্রতিদিন ব্যাটারি চার্জ দিতে ৩ থেকে ৫ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করছে। এর মধ্যে টেকনাফ পৌরসভায় ৩হাজার, সদরে আড়াই হাজার, হ্নীলায় ১হাজার ২০০, সাবরাংয়ের ১হাজার ৫০০, হোয়াইক্যং ৬শত, বাহারছড়ায় ৫শত ও সেন্টমাটিনে সাড়ে তিনশতটি সহ ৯হাজার ৬৫০টি টমটমে রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ইউপির চেয়ারম্যানরা। এসবের মধ্যে আশেপাশে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে চারশতাধিক ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজ। এর মধ্যে অনেক গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থাই টেকনাফে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। প্রায় সময় মনিটরিংয়ে এসব পড়ছে। তাদেরকে জরিমানাও করা হচ্ছে।
পর্যটন শিল্পে ধসের আশঙ্কা-
বিদ্যুৎ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পর্যটন খাতে। কয়েকটি এলাকায় হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউজে বিদ্যুৎ না থাকায় পর্যটকেরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেকেই আবার বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বুকিং বাতিল করে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ফিরে যাচ্ছেন।
হোটেল ব্যবসায়ী সোলায়মান হোসেন বলেন,‘দিনে পাঁচ থেকে আট বার বিদ্যুৎ চলে যায়। জেনারেটর চালাতে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
হিলটপে হোটেল মালিক গিয়াস উদ্দিন বলেন,‘একদিকে বিদ্যুৎ নেই, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেশি। পুরো পর্যটন খাত বড় সংকটে পড়েছে।’
বাড়ছে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা-
দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার কারণে টেকনাফে বিভিন্ন এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ও তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এই উদ্যোগের জন্য সবাইকে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে হবে।
ছাত্র প্রতিনিধি মোশেদ আলম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে যেন একসঙ্গে তিনটি সংকটে জর্জরিত- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও যানজট। এই ত্রিমুখী চাপ দ্রুত নিরসন না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রটির অর্থনীতি ও জনজীবন দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। শহরকে প্রধান্য দিয়ে গ্রামের প্রতিবৈষম্য করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে এ বৈষম্য মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য তোমাকে বেছে নিয়েছি। এসব টমটম কি দিয়ে চলে সেটা দেখার বিষয় রয়েছে। ’
টিআই মোখলেছুর রহমান বলেন, এ অবৈধ টমটমের কোন ধরনের সরকারি লাইসেন্স নেই। এসবের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ গিলে খাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এতো পরিমাণের টমটম বেড়ে গেছে নিয়ন্ত্রণে আনা কোনভাবে সম্ভব হচ্ছে না। অধিকাংশ সময় স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গারা ও এই টমটম পরিচালনা করছেন। ব্যবস্থা নিতে গেলেই এলাকার স্ব স্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ দাঁড় করিয়ে দেয়।
টেকনাফ পৌরসভার সচিব মহিউদ্দিন ফারাজী, সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ, বাহারছড়ার চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন, হ্নীলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী ও সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত আব্দুল মান্নান বলেন, দেশে দুটি প্যান্ডেল সিস্টেমে রিকশা ছিল। বর্তমানে অনুমোদনহীন এই টমটম চালু হয়েছে। সরকারি ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই টমটমের দূরত্ব অনেক বেড়ে গেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং এর কারণে টমটমে বিদ্যুৎ ব্যবহার খুবই দুঃখজনক বিষয়। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি রইল।
কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুতের টেকনাফের জোন ডিজিএম জসিম উদ্দিন বলেন, টেকনাফের বিদ্যুতের চাহিদা ৩৫ মেঃ ওঃ। বরাদ্দ ২২ হতে ২৫ মে:ও: পাওয়া যায়। আবার কক্সবাজার গ্রিড ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৩ কেভি লাইনের মাধ্যমে টেকনাফে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়। ফলে ভোল্টেজ ড্রপ/কম থাকে। ভোল্টেজ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে ২৭-২৮ মেঃওঃ এর বেশি লোড নেয়া যায় না। একারনে লোড বরাদ্দ থাকলেও রাত ব্যাপি ৬/৭ মে:ও: ফোর্স লোড শেডিং করতে হয়। টেকনাফ গ্রিড নির্মাণ হলে ভোল্টেজ এর মান বাড়বে ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমে আসবে। গ্রিড নির্মাণ এর কাজ চলছে। যা ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হতে পারে। টেকনাফে ৩৪২টি অনুমোদিত টমটম চার্জিং স্টেশন রয়েছে। তাছাড়া রাতে আবাসিক মিটার থেকেও অনেক গ্রাহক চার্জিং করে থাকে। অবৈধ টমটম চার্জিং প্রতিরোধের লক্ষ্যে নিয়মিত রাতে অভিযান / মনিটরিং প্রোগ্রাম চলছে। তনিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাসহ বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া, অপচয় রোধ করা এবং অবৈধ ব্যবহার রোধে টেকনাফবাসীকে সচেতন ও সোচ্চার হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক এস এম অনীক চৌধুরী বলেন,‘জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এটি যতটা সাশ্রয়ী হয়ে মোকাবিলা করা যায়, সে ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে কার্যকরের মাধ্যমে আমাদের কার্যক্রম চলছে।’ সেইসঙ্গে বিদ্যুৎনির্ভর অবৈধ বাহন সড়কে চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হবে।