সাইফুল আফ্রিদি
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে কস্তুরাঘাট এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে ডালপালা মেলেছে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু বিশাল বর্জ্যের পাহাড়। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর হিসেবে পরিচিত শহরটি এখন দিন দিন 'ভাগাড়ের' নগরীতে পরিনত হচ্ছে বলে অভিযোগ পর্যটক ও স্থানীয়দের। অনেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘বর্জ্যটন’ নগরী।
অথচ সমুদ্রসৈকতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা বোঝাতে পাঁচ টন প্লাস্টিক ও বোতল কুড়িয়ে বানানো হয়েছে বিশালাকার এক ‘প্লাস্টিক দানব’। কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষার এই শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন পর্যটকেরা। ঠিক এই সৈকত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে, কস্তুরঘাটে পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু এক বিশালাকার বর্জ্যের পাহাড়!
নদী,পরিবেশ ও শহর ধ্বংসের চিহ্ন, বিশালাকৃতির বর্জ্যের পাহাড়ের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপার) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করিম উল্লাহ কলিম।
তিনি লিখেন, 'কক্সবাজারের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বিখ্যাত সুরমা পাহাড়। মানবসৃষ্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাহাড়।'
সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)-এর আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিল্কি লিখেছেন, 'বর্জ্যটন নগরীতে স্বাগতম।'
অন্য এক নাগরিক মন্তব্য করেছেন, 'গিনেসবুক কর্তৃপক্ষের সুনজরে আনা উচিত, রেকর্ড হয়ে যাবে।'
জানতে চাইলে করিম উল্লাহ কলিম বলেন, 'পৌরসভার প্রধান কাজ হয়ে উঠেছে টমটমের লাইসেন্স। এ কারণে তারা জনগণের সেবাগুলোর প্রতি নজর দিতে পারছে না। গত ৩০ বছর ধীরে একটা পৌর শহরে এভাবে বর্জ্যের পাহাড় গড়ে উঠতে পারে না। এটাকে তারা যান্ত্রিক শহরে পরিণত করেছে।'
এদিকে পর্যটন শহরে এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে টুয়াক আহবায়ক মিজানুর রহমান মিল্কি বলেন, 'ডলফিন মোড়েই বর্জ্যের স্তূপ ও মশার উপদ্রব। কলাতলী প্রধান পয়েন্টেই নালা-নর্দমার পঁচা পানি সোজা গিয়ে পড়ছে সমুদ্রে। সুগন্ধা-লাবণীর দুই পাশে ময়লা। হোটেল মোটেল জোনে যত্রতত্র বর্জ্য। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের পর্যটনের মূল পয়েন্টগুলোতেই যদি এমন নোংরা অব্যবস্থাপনা থাকে, তবে এটাকে ‘পর্যটন নগরী’ না বলে ‘বর্জ্যটন নগরী’ বলাই শ্রেয়। সৈকতে ‘প্লাস্টিক দানব’ বানিয়ে পরিবেশ রক্ষার বুলি আওড়ানো সহজ, কিন্তু শহরের বুকের ‘বর্জ্য দানব’ সরাতে সদিচ্ছার যে চরম অভাব কস্তুরঘাটের ৫০ ফুট উঁচু পাহাড়টিই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।'
পর্যটকেরাও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন এমন অব্যবস্থাপনা নিয়ে। শুক্রবার বরিশাল থেকে আগত সুনন্দা ভৌমিক বলেন, 'কলাতলী পয়েন্টেই সমুদ্রে নামতে গিয়ে দেখি ড্রেনের ময়লা পানি সমুদ্রে যাচ্ছে। এটাতো পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্ট করছে,একইসাথে পরিবেশ দূষণ করছে। এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা দরকার।'
নীহারিকা রঞ্জনা, রাজশাহী থেকে এসেছেন। সমুদ্র সৈকতের বর্জ্য দানব প্রদর্শনী নিয়ে খুবই প্রশংসা তার মুখে। কিন্তু এর পরপরই জুড়ে দিলেন সৈকতের আশেপাশে দেখা নোংরা পরিবেশের কথা। বললেন, 'আশপাশের ঝাউবাগানেই বর্জ্যে ভরা। প্লাস্টিকও যেখানে সেখানে ফেলছে। বর্জ্যের সচেতন এই প্রদর্শনী যেন শুধু বিনোদনের না হয়ে বাস্তবে রূপ পায়।প্রশাসন যেন এমন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেন।'
# খুরুশকুল সেতুর মুখে দুর্গন্ধের অভ্যর্থনা
প্রতিদিন বিকেলে সূর্যাস্ত, নারকেল আর খেজুরি গাছের সারি, পাখির কিচিরমিচির আর কাশফুল দেখতে বাঁকখালী নদীর উপর খুরুশকুল সেতুর আশপাশে শত শত দর্শনার্থী ভিড় করেন। তবে সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগের আগেই পর্যটকদের পার হতে হয় কস্তুরঘাটের খোলা বর্জ্যের ভাগাড়। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ছড়ানো পঁচা দুর্গন্ধ বাতাসের সাথে মিশে দুর্বিষহ পরিবেশ তৈরি করে।
ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শাহীন, মনির ও মিহির রিকশায় চেপে নাক চেপে খুরুশকুল সেতু দেখতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, 'মারাত্মক দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম। জায়গাটা কত সুন্দর, কিন্তু এই নরকের কারণে কোনো সুস্থ মানুষ এখানে দ্বিতীয়বার আসার সাহস পাবে না।'
বাসটার্মিনাল, কলাতলী কিংবা সুগন্ধা পয়েন্ট শহরের প্রতিটি প্রবেশদ্বারেই খোলা ডাস্টবিন ও ময়লার স্তূপ। পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যখন বর্জ্য সংগ্রহ করতে বের হন, ততক্ষণে বিষাক্ত বাতাস ঢুকে পড়ছে শহরবাসীর ফুসফুসে।
# সৈকতের বালিয়াড়িতেই মিশছে হোটেলের ময়লা পানি
শুধু কস্তুরঘাটে বর্জ্যের পাহাড়ই নয়, কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টের চিত্রও চরম অব্যবস্থাপনায় ঢাকা পড়েছে। কলাতলী সৈকতের প্রধান প্রবেশপথের অবস্থা সবচেয়ে বেহাল। ড্রেনের ময়লা পানি সরাসরি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে। ড্রেন জ্যাম হয়ে সৃষ্টি হওয়া সেই দুর্গন্ধযুক্ত নোংরা পানি গড়িয়ে মিশছে সোজা সৈকতের বালিয়াড়িতে।
অন্যদিকে, সুগন্ধা পয়েন্টে ফিস ফ্রাইয়ের দোকানের অপরিকল্পিত বর্জ্যের পাশাপাশি 'সী প্রিন্সেস' ও 'গ্রীন নেচার'-এর মতো অধিকাংশ হোটেলের কোনো বর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) না থাকায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সরাসরি সৈকতে। সীগাল পয়েন্টে যেখানে সচেতনতার বর্জ্য দানব তার আশেপাশের ঝাউতলায়ও ময়লা আর বর্জ্যের দুর্গন্ধ। ফলে এসব পয়েন্টেই এখন প্লাস্টিক, বোতল, কলার খোসা, ডাব এবং পলিথিনে সয়লাব।
# বাঁকখালী নদীকে গিলে খাচ্ছে ক্ষতিকর ‘লিচেট’
কস্তুরঘাটে বাঁকখালী নদীর ঠিক তীর ঘেঁষে প্রায় ১১ একর জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে এই বর্জ্যের রাজত্ব। স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের মতে, সৈকতে কৃত্রিম সচেতনতা সৃষ্টি করা হলেও আসল পরিবেশ হত্যা চলছে নদীর তীরে।
বৃষ্টির দিনে এই ৪০-৫০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ থেকে ধুয়ে আসা বিষাক্ত তরল (লিচেট) সরাসরি গিয়ে পড়ছে বাঁকখালী নদীতে। এতে শুধু নদীর নাব্যতা নষ্ট হচ্ছে না, বরং নদীর মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে অনায়াসে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক ও কেমিক্যাল, যা রূপ নিচ্ছে নীরব ঘাতক বিষে।
কক্সবাজার পৌরসভার তথ্যমতে, শহরে প্রতিদিন গড়ে ১৭০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় ১২০ থেকে ১৩০ টন। আর বাকি বিশাল একটি অংশ নালা-নর্দমা হয়ে নামছে সাগরে-নদীতে। সংগৃহীত বর্জ্য ফেলার কোনো নির্ধারিত আধুনিক প্ল্যান্ট ৩০ বছরেও গড়ে তুলতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ ট্রাক বর্জ্য নিয়ে সোজা খালাস করা হয় নদীর তীরে। গরু-ছাগল, পশু-পাখি এসব বর্জ্য থেকে খাবার খোঁজে খায় এতে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়।
স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন কবে হবে? -এমন প্রশ্নে পৌরসভার প্রকৌশলী পরাক্রম চাকমা জানান, শহরের এসএম পাড়ায় সাড়ে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া (৭ ধারা নোটিশ) চলছে। ২০২৮ সালের আগেই কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পৌরসভার তথ্য মতে, প্রতিদিন ১৭০ টন বর্জ্য তৈরি হলে আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত কেবল এই ৩ বছরেই কক্সবাজারে উৎপন্ন হবে প্রায় ১ লাখ ৮৬ হাজার টন নতুন বর্জ্য। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ টন করে কস্তুরঘাটে ফেলা অব্যাহত থাকলে, ২০২৮ সালের মধ্যে কস্তুরঘাটের ওই এক স্থানেই আরও প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন বর্জ্যের নতুন পাহাড়ে চাপা পড়বে বাঁকখালী নদী! এতে ৫০ ফুটের বর্তমান পাহাড়টির উচ্চতা কতগুণ ছাড়িয়ে যাবে আর দূষণের পারদ কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেই আশঙ্কা বাড়ছে দিনদিন।
কস্তুরঘাটে নদী দূষণের সত্যতা স্বীকার করে পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, 'বর্জ্যের পাহাড় থেকে প্রতিনিয়ত প্রচুর পরিমাণে বিষাক্ত ‘লিচেট’ বাঁকখালী নদীতে মিশছে। এই দূষিত কালো পানি নদী ও সাগরের সামগ্রিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় মারাত্মক বায়ুদূষণ ঘটছে।'
তিনি আরও জানান, 'খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলে পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে পৌরসভার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যেই এই বর্জ্য অপসারণ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন তারা ২০২৮ সালের যে কথা বলছে, নির্দিষ্ট সেই সময়েও এটি সরবে কি না এমন প্রশ্নে বলেন, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।'
কস্তুরঘাটের এই পরিবেশগত অপরাধ বন্ধের দাবিতে ইতিমধ্যেই আন্দোলনে নেমেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ‘আট মহল্লা সমাজ কমিটি’র উদ্যোগে পৌরসভা প্রাঙ্গণে স্মারকলিপি ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।