বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করে না এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। ফলে বায়ু বিদ্যুৎকে 'সবুজ শক্তি' বা 'গ্রিন এনার্জি' বলা হয়। এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস থেকে তৈরি হয়। আর সেই ‘সবুজ শক্তির বিপ্লব’ দেখিয়েছে সমুদ্র পাড়ের হাওয়া বা বাতাস।
কক্সবাজারের উপকুলে স্থাপিত বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে ২০২৩ সালের মে মাসে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে এপ্রিল থেকেই। সেই ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুন পর্যন্ত দুই বছরে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৯ দশমিক ২১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
যেটিকে সবুজ শক্তির সাফল্য বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি।
কক্সবাজার সদর উপজেলা খুরুশকুল, পোকখালী, পিএমখালী আর চৌফলদণ্ডী-এই চারটি ইউনিয়নে স্থাপন করা বিশাল বিশাল ২২ টি বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন নিয়েই কক্সবাজার বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যেখানে খুরুশকুলে ৮টি, পিএমখালীতে ২টি, চৌফলদন্ডীতে ৭টি ও পোকখালীতে ৫টি। প্রতিটি টারবাইনের জন্য ব্যবহার করা হয় ২০ শতক জমি। আর এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট।
প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেছেন, বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটার ছাড়ালেই শুরু হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন। এটি সর্বোচ্চ উৎপাদনে যেতে বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৯ মিটারের বেশি হওয়া প্রয়োজন। কক্সবাজারের উপকূলে সমুদ্র কিনারে এই বায়ু কেন্দ্র। যেখানে কম-বেশি বাতাস থাকে। ফলে প্রতিটি ১৫ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে কখনও কখনও ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন। দূর থেকে দেখলে মনে হয় প্রকৃতির বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নতুন প্রযুক্তির সারি। সমুদ্রের কিনারের প্রকৃতির হাওয়ায় ঘুরছে বিশাল বিশাল ব্লেড; প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। আর ৯০ মিটার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থাকা দানবীয় টারবাইনগুলো যেন আধুনিক বাংলাদেশের নতুন শক্তির প্রতীক। যেখান থেবেই উৎপাদন হচ্ছে বিদ্যুৎ।
কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের শিফ্ট ইনচাজ মানিক আহমেদ বলেন, কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিটি টারবাইনের উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার এবং প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য ৬০ মিটার। এসব টারবাইন চীনে নির্মিত হয়ে জাহাজে করে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয় এবং পরে বার্জের মাধ্যমে কক্সবাজারে পরিবহন করে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি টারবাইনের জন্য প্রায় ২০ শতক জমির প্রয়োজন হয়েছে।
প্রতিটি টারবাইনের উৎপাদন ক্ষমতা ৩ মেগাওয়াট। বাতাসের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৩ মিটারের বেশি হলে টারবাইনগুলো প্রাথমিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, যা সাধারণত ৩০০ কিলোওয়াট থেকে ৩.৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করে। তবে বাতাসের গতি যখন প্রতি সেকেন্ডে ৯ মিটার বা তার বেশি হয়, তখন প্রতিটি টারবাইন সর্বোচ্চ ৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এই অবস্থায় পুরো কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়।
মানিক আহমেদ বলেন, এটি একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, যেখানে গ্যাস, তেল বা কয়লার কোনো ব্যবহার নেই। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বাতাসের শক্তি ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
তিনি জানান, এখানে ৮ জন বাংলাদেশি ইঞ্জিনিয়ার অপারেশন ও মেইনটেনেন্স টিমে কাজ করছেন, যারা চার বছরের অভিজ্ঞতায় এখন অনেক ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করছেন।
ইঞ্জিনিয়ার মানিক আহমেদ বলেন, কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র থেকে আসা নিয়মিত বাতাস এই প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। যদি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে এ ধরনের টারবাইন স্থাপন করা যায়, তাহলে আরও বড় পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে বায়ুবিদ্যুৎ একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
কক্সবাজার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প সময়ন্বকারী কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, কক্সবাজারে অবস্থিত বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সফলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রকল্পটিতে টেকনিক্যাল টিম, শিফট ইনচার্জ এবং মেকানিক্যাল ইনচার্জের তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিকভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে বায়ুর গতিবিধির ওপর নির্ভর করে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ওঠানামা করছে। গড়ে ৩০ থেকে ৪০ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
'উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ কক্সবাজারের খুরুশকুল সাবস্টেশনের মাধ্যমে প্রায় ৪০টি গ্রিড টাওয়ার হয়ে ঝিলংজা গ্রিড উপকেন্দ্রে সংযুক্ত হচ্ছে। সেখান থেকে এটি দেশের জাতীয় গ্রিডে প্রবাহিত হয়ে সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে অবদান রাখছে।'
এনামুল হক বলেন, 'বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে বায়ুবিদ্যুৎ প্রযুক্তি এখনও তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও এটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। বিশেষ করে সমুদ্রবেষ্টিত ও উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রযুক্তির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশও এই খাতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। কক্সবাজারের ৬০ মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের একটি অনন্য ও পাইলট প্রকল্প হিসেবে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বর্তমানে এটি সফলভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।'
এনামুল হক আরও বলেন, 'এই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে- বায়ু ও সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশের আমদানি নির্ভরতা-বিশেষ করে কয়লা, এলএনজি এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা-উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এতে শুধু জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও দেশ লাভবান হবে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিকল্পনায় বায়ু ও অন্যান্য সবুজ জ্বালানিকে অগ্রাধিকার প্রদান করেন। কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে অবদান রেখে দেশের জ্বালানি খাতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।'
কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন, কক্সবাজারের সাবস্টেশনে প্রতিদিন গড়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৫০ মেগাওয়াট। বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কক্সবাজারের চাহিদার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে।
কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মুখপাত্র আবিদ আহসান সাগর বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ না থাকলে সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, টেকনাফ, মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় উত্তর ও দক্ষিণ দিকের বাতাসের প্রবাহ অনেকটাই স্থিতিশীল। এসব এলাকার বায়ুর গতিবেগ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে যদি কার্যকরভাবে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।