দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কক্সবাজার সিটি কলেজ। বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে বহুতল বিভাগীয় ভবন, প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এবং দেড় শতাধিক শিক্ষকের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ জেলার উচ্চশিক্ষার প্রধান ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে।
১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুদানে প্রাপ্ত পাঁচ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটি আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার জেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার আলোয় আলোকিত করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কলেজটি সরকারি করার দাবি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি করা না হলে নানা সংকটে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কলেজ সংশ্লিষ্টরা জানান, বহু আগেই কক্সবাজার সিটি কলেজকে সরকারি করা প্রয়োজন ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং কক্সবাজারের কৃতী সন্তান বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পৃক্ততা থাকায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কলেজটি সরকারি করার যৌক্তিক দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক, কলেজ কর্তৃপক্ষ, রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলসহ সর্বস্তরের মানুষ এ দাবিতে সোচ্চার রয়েছেন। বিএনপি সরকার গঠন এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিষয়টি এখন কক্সবাজারবাসীর অন্যতম প্রধান দাবিতে পরিণত হয়েছে। আগামী ১৩ জুন ঐতিহাসিক কক্সবাজার সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দাবির মধ্যে কক্সবাজার সিটি কলেজকে সরকারি করার দাবিটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জাতীয়করণকরণ ছাড়া কলেজ পরিচালনা কঠিন: কক্সবাজার সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক আকতার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, "কক্সবাজার সিটি কলেজ এখন যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, সেখানে সরকারি করা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। প্রফেশনাল কোর্সসহ ১৭টি বিষয়ে অনার্স, ৬টি বিষয়ে প্রিলিমিনারি, ৭টি বিষয়ে মাস্টার্স এবং উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি ও কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।"
তিনি বলেন, ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পাঠদান নিশ্চিত করা, ১৫৫ জন শিক্ষক ও ৫৫ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক আকতার উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, "জমির পরিসর, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, মনোরম পরিবেশ এবং কক্সবাজার শহরের অবস্থান বিবেচনায় কলেজটি সরকারি করা খুবই সহজ হবে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিক স্মারকলিপিও দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর উপলক্ষেও আমরা কলেজটি সরকারি করার জোর দাবি জানাচ্ছি।"
কলেজের পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন বলেন, "সবদিক বিবেচনায় বহু আগেই কলেজটি সরকারি করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও কক্সবাজারের কৃতী সন্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পৃক্ততার কারণে আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং তারেক রহমানের মতো শিক্ষানুরাগী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁর কক্সবাজার সফর উপলক্ষে আমরা এ দাবি জানাচ্ছি। আশা করি কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি হিসেবে তিনি কক্সবাজারের শিক্ষার অনন্য বাতিঘর কক্সবাজার সিটি কলেজকে সরকারি করার উদ্যোগ নেবেন।"
কক্সবাজার সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ফজলুল করিম বলেন, "কক্সবাজার একটি সম্ভাবনাময় ও সমৃদ্ধ জেলা। পর্যটনসহ নানা কারণে জেলাটির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এখানে শিক্ষার প্রসার আরও বেশি প্রয়োজন। কক্সবাজার সিটি কলেজ ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য কলেজটি সরকারি করার কোনো বিকল্প নেই।"
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর সিআইপি বলেন, "পর্যটন, ব্লু ইকোনমি ও আন্তর্জাতিক সম্ভাবনার কারণে কক্সবাজার এখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এই গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাক্ষেত্রেও জেলার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। কক্সবাজার সিটি কলেজকে সরকারি করা সময়ের দাবি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ দাবি জানাচ্ছি।"
এমপি লুৎফুর রহমান কাজলের উদ্যোগ: কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল জানিয়েছেন, স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারি করার লক্ষ্যে তিনি ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডি.ও. লেটার (আধা-সরকারি পত্র) জমা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, "কলেজের পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার সফর উপলক্ষেও সাধারণ মানুষ এ দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। আশা করি প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারবাসীর এই ন্যায্য দাবিটি পূরণ করবেন।"
কক্সবাজারবাসীর প্রত্যাশা: আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী কক্সবাজারের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কক্সবাজার সিটি কলেজকে সরকারি করার দাবিতে এখন একাত্ম হয়েছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক কক্সবাজার সফরকে ঘিরে তাদের প্রত্যাশা—এই সফরেই উচ্চশিক্ষার বাতিঘর কক্সবাজার সিটি কলেজের সরকারি করার প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।