সুজাউদ্দিন রুবেল, সেন্টমার্টিন থেকে
রূপকথার দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ফিরেছে নতুন সাজ। নীল জলরাশি, সবুজের সমারোহ আর বালিয়াড়ির লতাগুল্মে প্রকৃতি মেলে ধরেছে তার চিরচেনা সৌন্দর্য। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে ৩’শোর বেশি হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন শুধু পর্যটকদের অপেক্ষা।
রোববার (১ নভেম্বর) থেকে রাত্রিযাপনসহ পর্যটকদের জন্য দ্বীপটি উন্মুক্ত হয়। তবে জাহাজ চলাচলের অনুমতি নিয়ে জটিলতার কারণে পর্যটকদের যাত্রা শুরু হচ্ছে ৫ নভেম্বরের পর। ফলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দ্বীপের ব্যবসায়ীরা। পর্যটকদের আগমনে আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে-এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
নীল সমুদ্রের বুকে সবুজে ঘেরা এই দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছরই ভিড় করেন পর্যটকেরা। তবে পর্যটন মৌসুমের শুরুতে এবারও নানা প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজ শেষ করেছে। পর্যটকদের সেবা দিতে প্রস্তুত তাঁরা।
হোটেল ব্লু মেরিনের ব্যবস্থাপক মো. মান্নান বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আমরা আবারও হোটেলের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতিমধ্যে অধিকাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা এক দিনের মধ্যেই শেষ করা সম্ভব। সব মিলিয়ে আমরা পর্যটকদের সেবা দিতে প্রায় পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন শুধু অতিথিদের অপেক্ষায় আছি।’
শুধু হোটেল নয়, পর্যটকদের খাবারের চাহিদা পূরণেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। শাহীনা রেস্তোরাঁর কর্মচারী রফিক উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রেস্তোরাঁটি পুনরায় চালুর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের আগমন শুরু হতে পারে। এর আগেই সব প্রস্তুতি শেষ করার চেষ্টা করছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন পর্যন্ত সবকিছু সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
পর্যটকদের আগমনকে ঘিরে শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যেই নয়, আশার সঞ্চার হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও। তাঁদের অনেকের জীবিকা সরাসরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটকের সংখ্যা ও অবস্থানের সময় বাড়লে আয়-রোজগারের সুযোগও বাড়বে বলে আশা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বলেন, আগে পর্যটন মৌসুমে মাত্র দুই মাস পর্যটকদের রাতযাপনের সুযোগ ছিল। পর্যটকদের যাতায়াতেও সীমাবদ্ধতা ছিল। এবার রাতযাপনের সময়সীমা পাঁচ মাস করা হয়েছে। পর্যটক আসার সীমাও বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ করা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তে স্থানীয় বাসিন্দারা খুশি। তিনি বলেন, ‘আগে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের অনেক কষ্ট হতো। এখন আমরা অনেক খুশি। আশা করছি, এতে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও আয়-রোজগারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
পর্যটন মৌসুমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বীপের পরিবহন খাতের মানুষের জীবিকাও। পর্যটক কম থাকলে আয় কমে যায়, অনেক সময় বেকার থাকতে হয় তাঁদের। ইজিবাইকচালক রাশেদুল আলম বলেন, ‘আগে পর্যটন মৌসুমের বাইরে গাড়ি নিয়ে বের হলেও তেমন আয় হতো না। বছরের প্রায় ১০ মাসই আমাদের অনেকটা বেকার থাকতে হতো। অপেক্ষায় থাকতাম, কখন পর্যটন মৌসুম শুরু হবে, কখন পর্যটকদের সেবা দিয়ে কিছুটা আয়-রোজগার করতে পারব। এবার পর্যটকদের জন্য সময়সীমা বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তে আমরা খুবই খুশি। আশা করছি, এতে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়বে।’
তবে পর্যটকদের আগমনে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক প্রশাসন। পর্যটন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে নজরদারি রাখা হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ক্ষেত্রে পর্যটক, হোটেল-রিসোর্ট মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শাহিদুল আলম বলেন, পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। গত বছরও এ বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ছিল। এবারও এখন পর্যন্ত যেসব নির্দেশনা পাওয়া গেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে।
শাহিদুল আলম আরও বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে পরিবেশ সুরক্ষাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ যাতে তাঁরা যথাযথভাবে মেনে চলেন, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্ট মালিকসহ পর্যটন খাতের সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটকদের পদচারণে আবারও মুখর হয়ে উঠবে সেন্টমার্টিন-এমন প্রত্যাশা দ্বীপবাসীর। তবে পর্যটনের সুযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হলে তবেই রূপকথার এই দ্বীপের সৌন্দর্য টিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্য।