মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিলেন এক অসহায় নারীকে। খাবার দিয়েছেন, থাকার ব্যবস্থা করেছেন নিজের ঘরেই। কিন্তু সেই আশ্রিত নারীই চারদিন পর নাস্তা কিনে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান পরিবারের তিন বছরের শিশুকে। এরপর ফোন করে দাবি করেন তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ।
অবশেষে পুলিশের বিশেষ অভিযানে রোববার (০৭ জুন) সন্ধ্যায় মহেশখালী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে শিশুটিকে। আটক করা হয়েছে অভিযুক্ত রোহিঙ্গা নারী রং বাহারকে।
মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছিলেন এক অসহায় নারীকে। কিন্তু সেই আশ্রিত রোহিঙ্গা নারীই অভিযোগ অনুযায়ী অপহরণ করেন আশ্রয়দাতার শিশুকে। পরে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, উখিয়ার কুতুপালং-২ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রং বাহার গত ৩ জুন কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। পরে কারাগারের পাশে অবস্থানকালে স্থানীয় বাসিন্দা সাদ্দাম ও তার স্ত্রী সুমি আক্তার মানবিক কারণে তাকে নিজেদের বাসায় আশ্রয় দেন। কিন্তু ৬ জুন সন্ধ্যায় সুযোগ বুঝে তিন বছরের শিশুটিকে নিয়ে চলে যান তিনি।
উদ্ধার শিশু আরবী হোসেনের মা সুমি আক্তার বলেন, “এক নারী কক্সবাজার জেলা কারাগারে তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে এসে পরে আশ্রয়ের অভাবে রাস্তায় অবস্থান করছিলেন। বিষয়টি দেখে আমার স্বামী আমাকে তাকে আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে বলেন। পরে আমরা তাকে আমাদের বাসায় থাকতে দিই। আশ্রয় নেওয়ার চার দিনের মাথায় ওই নারী আমার সন্তানকে নাস্তা কিনে দেওয়ার কথা বলে বাসা থেকে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানকে বলে পানির জন্য যাবে এবং নাস্তা কিনে দেবে। এরপর তাকে নিয়ে বের হয়ে যায়। আমরা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারিনি। পরে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই নারী আমার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তখন আমরা তার মোবাইল নম্বরে বারবার ফোন করি। কখনও ফোন রিসিভ করে, আবার বন্ধ করে দেয়।’
সুমি আক্তার আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে সে ফোন করে আমার সন্তানের মুক্তির জন্য তিন লাখ টাকা দাবি করে। আমি তাকে বলি, এত টাকা কোথায় পাব? আমরা তাকে রাস্তায় থেকে তুলে এনে আশ্রয় দিয়েছি, অথচ সে আমাদের সঙ্গে এমন করছে। কিন্তু সে বলে, টাকা না দিলে সন্তানকে আর ফিরে পাব না।’
তিনি জানান, ‘সন্তানের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা রাতেই বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে কয়েক দফায় টাকা পাঠাই। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা, পরে ৫ হাজার ও ২ হাজার টাকাসহ মোট কয়েক দফায় অর্থ দেওয়া হয়। টাকা না দিলে সন্তানের ক্ষতি করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ফোনে সন্তানের কান্নার শব্দও শুনতে পেয়েছি। তখন আমার স্বামী অনুরোধ করে বলেন, যত টাকা লাগে দেবেন, শুধু সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু টাকা নেওয়ার পরও অপহরণকারী মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়।’
আরবী হোসেনের পরিবারের আরেক সদস্য জানান, “অভিযুক্ত নারীকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়ার পর তিনি প্রায় চার দিন আমাদের বাসায় ছিলেন। পরে নাস্তা খাওয়ানোর কথা বলে শিশুটিকে বাসা থেকে নিয়ে যান। এরপর তাকে অপহরণ করে অন্যত্র আটকে রাখা হয়। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে প্রথমে ৩ লাখ টাকা এবং পরে আড়াই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।”
তবে অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার না করলেও ঘটনার পেছনে ভিন্ন কারণের কথা বলছেন আটক রোহিঙ্গা নারী।
অপহরণের অভিযোগে আটক রোহিঙ্গা নারী রং বাহার বলেন, “সাদ্দাম আমার মোবাইল ফোন ফেরত দিচ্ছিল না। তাই ক্ষোভ থেকে তার শিশুসন্তানকে নিয়ে যাই। পরে ফোন করে তাকে বলি, আমার মোবাইল ফিরিয়ে দিলে তোমার সন্তানকে ফেরত পাবে। কিন্তু সাদ্দাম জানায়, সে মোবাইলটি ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। এরপর সে আমাকে মোবাইলের পরিবর্তে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা, পরে ৫ হাজার এবং আরও ২ হাজার টাকা বিকাশে পাঠায়। মূলত আমার মোবাইল ফোন ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যেই আমি এ কাজ করেছি।”
তিনি আরও জানান, তার নাম রং বাহার। তিনি কুতুপালং ২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। পরে মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকার এক যুবককে বিয়ে করার পর থেকে সেখানেই বসবাস করছেন।
পুলিশ জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর মোবাইল ট্র্যাকিং ও অভিযান চালিয়ে মহেশখালী থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় আটক করা হয় রং বাহারকে। উদ্ধার হওয়া শিশুটি বর্তমানে পরিবারের কাছে রয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার পরিদর্শক শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, “শিশুটিকে অপহরণ করে তার পরিবারের কাছে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে সাব-ইন্সপেক্টর রফিকের নেতৃত্বে একটি মোবাইল টিমকে মহেশখালীতে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে মহেশখালী থানাকে অবহিত করা হয়। যৌথ অভিযানে শিশুটিকে নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হই এবং ঘটনার মূল অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মূল আসামিকে আটক করা হয়েছে। তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’”
এদিকে- যাকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, তার বিরুদ্ধেই শিশুকে অপহরণের অভিযোগ। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।