রেজাউল করিম চৌধুরী
শরণার্থী শিবিরে স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে স্থানীয় এনজিও নেতা নুরুল আমিন ভাইয়ের একটি মৃদু প্রতিক্রিয়া আমি দেখেছি। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন যে, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং এনআরসি একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করছে। এর আগে একটি কোম্পানি এবং ব্র্যাক হালকা মালামাল দিয়ে দোতলা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। যতটুকু জানতে পেরেছি, ব্র্যাক এবং ওই কোম্পানির তৈরি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অর্থায়ন করেছিল ইউএনএইচসিআর।
এক স্থানীয় সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে আরআরআরসি স্বীকার করেছে যে এগুলোর সরকারি অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু এখানে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায়—এই জমিগুলোর বেশিরভাগই বন বিভাগের, বন বিভাগ কি এর অনুমতি দিয়েছে? তার ওপর উখিয়াতে এই স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে; স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সরকার, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে পূর্ব আলোচনা করার ব্যাপারে এতটা উদাসীন কেন? আমরা সবাই জানি, তৎকালীন সরকার তথাকথিত ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বাড়াতে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মতামত না নিয়েই ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকে মেনে নিয়েছিল। শরণার্থী সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করা আবশ্যক-এটিই আমার মূল উদ্বেগ।
আমার কিছু বন্ধু, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বন্ধুদের কয়েকজন, নুরুল আমিন ভাইয়ের এই মতামতের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। যেন আমরা শরণার্থীদের মানবাধিকারের বিরোধিতা করছি! শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১৭টি জাতিসংঘ সংস্থা এবং ৬১টি আন্তর্জাতিক এনজিও কাজ করছে। তারা কি কখনো তাদের নিজেদের দেশে মিয়ানমার জান্তার গণহত্যার বিরুদ্ধে এবং তাদের জবাবদিহিতার দাবিতে কোনো ক্যাম্পেইন বা প্রতিবাদ করেছে? এখন পর্যন্ত এমন কোনো উদাহরণ নেই।
রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বড় দাতা সংস্থা হলো ইউএসএইড; অথচ তাদের নিজেদের দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) বা তাদের মিত্রদের সাথে রুয়ান্ডার একটি অনৈতিক চুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসী বা শরণার্থীদের রুয়ান্ডায় ফেরত পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়ান এইড রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি অন্যতম বড় দাতা; তাদেরও পাপুয়া নিউগিনির সাথে একইভাবে অবৈধ অভিবাসী বা শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর অনৈতিক চুক্তি রয়েছে। আবার জাপান সরকারের ক্ষেত্রে দেখুন, মাত্র একটি কৃষক পরিবার তাদের জমি দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে প্রায় এক দশক ধরে নারিতা বিমানবন্দরের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আমাদের সরকার হয় অত্যন্ত উদার, না হয় দুর্বল। যার কারণে জাতিসংঘ এবং আইএনজিও-র কিছু কর্মকর্তা আমাদের সরকারের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, যা তারা নিজের দেশে কখনোই করতে পারতেন না। এটি স্পষ্টতই একটি দ্বিমুখী নীতি। আমরা নীতিগতভাবে মানবাধিকারকে সম্মান জানাতে সম্মত, তবে তা অবশ্যই স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা হোস্ট কমিউনিটির অধিকার, উদ্বেগ এবং সমস্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। মনে রাখবেন, কক্সবাজার বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ জেলা। এখানকার মানুষের জীবিকা অনেকাংশেই প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন—জমি, বন, ধান, লবণ এবং মাছের ওপর নির্ভরশীল।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ফাউন্ডেশন।