অবশেষে কলাতলীতে সরকারি জমিতে রাতারাতি গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে কথিত দখলদার চক্র। তবে, বৈশাখী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে ট্রাভেল এজেন্সী, বাস কাউন্টার ও চায়ের দোকানসহ অন্তত ১৬ টি স্থাপনা রয়ে গেছে অক্ষত। প্রশাসন একদিনের সময়সীমা দিলেও বিতর্কিত স্থাপনা না সরিয়ে অন্য স্থাপনা সরানোর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, ১ নং খাস খতিয়ানের জমিতে গত কয়েকমাসে অন্তত ৩৫টির বেশি দোকান গড়ে তুলেছে একটি চক্র। যেগুলো থেকে এককালীন কয়েক কোটি টাকা সেলামী ও মাসিক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। এছাড়া গত কয়েকদিনে নতুন করে আরও ১৯টি নতুন দোকানঘর নির্মাণের খবর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নজরে আসে প্রশাসনের। পরে সরকারি জমিতে গড়ে উঠা সকল অবৈধ স্থাপনা নিজ উদ্যেগে সরিয়ে নিতে চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশ দেয় জেলা প্রশাসন। নোটিশের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে নবনির্মিত স্থাপনা সরিয়ে নেয় অভিযুক্তরা। কিন্তু আগের স্থাপনা না সরিয়ে অন্য স্থাপনা সরানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এদিকে পুরো জায়গা উচ্ছেদ নিশ্চিত করতে আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) সরেজমিন পরিদর্শনে যাচ্ছে প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের পর্যটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, নোটিশ অনুযায়ী বেড়াসহ সব ধরনের ভিত্তিকাঠামো পুরোপুরি না সরানো হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, নতুন স্থাপনা সরলেও বৈশাখী রেস্টুরেন্টসহ পুরোনো অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের বিষয়ে সদর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। পরবর্তীতে জমিটি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে ভবিষ্যৎ পুনর্দখল ঠেকাতে সরকারি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সীমানা ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (০১ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কলাতলী বৈশাখী রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে অবৈধ ১৬ নবনির্মিত দোকান এখনও অক্ষত আছে। এর পরে ১৯ টি দোকানের কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। বিকেল গড়ালে আবারও টিনের বেড়া দিয়ে উক্ত জমি ঘেরাও করে দখলে নিয়েছে দখলদারেরা।
কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আজিজ নামের ব্যক্তির মাধ্যমে তারা আবারও ঘেরাও-এর কাজ করছে। তারা জানান, আজিজ মাঝি তাঁদেরকে কন্ট্রাকে কাজ করাচ্ছেন। কার জমি, কার স্থাপনা এসব বিষয়ে তারা কিছুই জানেনা।
জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ঝিলংজা মৌজার (কলাতলী থেকে লাবনী) কয়েক একর সরকারি জমি দখল হয়ে যায়। যার মূল্য শত কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৪ জুন সুগন্ধায় বাকঁখালী শুটকি মার্কেটের উত্তর পাশে সাচ্চিদানন্দ সেন গুপ্ত নামের এক ব্যক্তির দখলে থাকা ২ দশমিক ৩৯ শতক সরকারি জমি দখলমুক্ত করেছিল প্রশাসন। যেখানে ১১০ টি দোকান গুঁড়িয়ে দিয়ে তোলা হয়েছিল প্রশাসনের সাইনবোর্ড। একই বছর প্রসাদ প্যারাডাইসের দক্ষিণে দখল হয়ে যাওয়া ১ একর জমি উচ্ছেদ করেছিলেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভ্রাম্যমান আদালত। গত ১৭ আগস্ট সুগন্ধা পয়েন্টে রাতারাতি দখল হয়ে যাওয়া ৩ একরের মতো সরকারি জমি দখলমুক্ত করে জেলা প্রশাসন৷ ধারণা করা হচ্ছে, দখলমুক্ত হওয়া এসব জমির পরিমান কম হলেও হাজার কোটি টাকা।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল সরকার টেকনাফ থেকে নাজিরার টেক পর্যন্ত এলাকাকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে উচ্চ আদালতের এক রায়ে কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনের ৪৯টি প্লট একসাথে বাতিল করে। এরপর ২০১৮ সালে আরেকটি রায়ে হোটেল -মোটেল জোন এসব জমি ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করেন। বিশেষ করে, ২০০০৩ দাগের ৩৯ দশমিক ৭৮ একর জমি সম্পূর্ণভাবে খাস হয়ে যায়।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ২০০০৩ দাগের সম্পূর্ণ জমি ছাড়াও বাতিলকৃত সকল প্লট বর্তমানে সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, 'কলাতলীতে অবৈধ স্থাপনা সরাতে একদিন সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই তারা স্থাপনা নিজ উদ্যেগে সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব জমিতে পূণরায় কেউ স্থাপনা করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এডিএম বলেন, 'সরকারি জমি প্রয়োজনে উন্মুক্ত থাকবে, তাই বলে কেউ দখল করবে, এটা হতে দেওয়া যাবে না। প্রশাসন থেকে লোক গিয়ে দেখে আসবে, যদি সরকারি জমি হয়, তাহলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।'
জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান বলেন, বাতিলকৃত সকল প্লট এখন সরকারের। এগুলো সরকারি ১ নং খাস খতিয়ানে রেকর্ড আছে। সুতরাং এসব জায়গায় কেউ স্থাপনা ও দখল করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।