# হার্ডলাইনে যাচ্ছে পৌরসভা
# উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা
# জটিলতার মুখে সেবা প্রত্যাশীরা
# সরকারি টাকা আদায়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি
ছাড় (রিবেট) সুবিধা দিয়েও হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ বকেয়া ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা আদায় করতে পারছে না কক্সবাজার পৌরসভা। বারবার নোটিশ দিয়েও ব্যর্থ হচ্ছে স্বায়ত্তশাসিত এই প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে কর আদায়ে উদাসীনতা ও অনিয়মের কারণে রাজস্বে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও নাগরিক সেবা পরিচালনায় আর্থিক সংকটে পড়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
পৌরসভার কর বিভাগের দাবি, নাগরিক পর্যায়ে কর কিছুটা আদায় হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা) ও সরকারি দপ্তরের হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া পড়েছে প্রায় ৫ কোটির কাছাকাছি। নিয়ম থাকলেও অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান কখনোই হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেনি।
কক্সবাজার পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৯ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয় কক্সবাজার পৌরসভা। যার আয়তন ৩২ দশমিক ৯০ বর্গ কিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আদমশুমারী মতে পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৫ জন। তবে এ সংখ্যা বর্তমানে ৫ লাখের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। পৌরসভার হোল্ডিং সংখ্যা ২৮ হাজার ৩৪৫টি। এর মধ্যে নিয়মিত কর দিচ্ছেন ২ থেকে ৩ শতাধিক মালিক। অবশিষ্ট হোল্ডিং মালিক অনিয়মিত কর দেন না।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই পৌরসভার কর বকেয়া ২ কোটি ৪২ লাখ ২২ হাজার ৭০০ টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (স্কুল,কলেজ, মাদ্রাসা) কাছ থেকে পৌরসভার কর বকেয়া ২ কোটি ২৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকাসহ মোট বকেয়া ৪ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার ৭০৯ টাকা। ২০১২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বেশিরভাগ কর বকেয়া বলে জানান পৌর কর্তৃপক্ষ। এসব হোল্ডিং -এর অনুকূলে কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান পৌরসভার প্রতিষ্ঠার পর থেকে হোল্ডিং কর বকেয়া রেখেছেন। আবার অনেক বাসা বাড়ির মালিক বছরের পর বছর হোল্ডিং না খুলে পৌর কর ফাঁকি দিচ্ছেন। বকেয়া কর আদায়ে বিভিন্ন সময় পৌরসভার উদ্যোগে মাইকিং করলেও ফলদায়ক তেমন কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে কর পরিশোধ না করায় বিভিন্ন ধরনের প্রত্যয়নপত্র, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, হোল্ডিং সংক্রান্ত ছাড়পত্রসহ অন্যান্য সেবা গ্রহণে জটিলতার মুখে পড়ছেন সেবা প্রত্যাশীরা।
সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের অভিযোগ, কর বকেয়া থাকার কারনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে পারছেন না তারা। তবে অনেকের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এককালীন বকেয়া কর পরিশোধ করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তারা কিস্তিতে কর পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান।
পৌরসভার এক ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তা জানান, পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান একবারও কর দেননি। এছাড়া বেসরকারি ও বাসাবাড়ির করও বছরের পর বছর বকেয়া রয়েছে। পৌরসভার অভ্যন্তরীণ রাজস্ব খাত হওয়ার পরেও কর আদায়ে দীর্ঘদিনের গাফিলতির কারণে পৌরসভার পক্ষে থেকে কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। যদি সময়মতো করদাতারা হোল্ডিং কর পরিশোধ করতেন, তাহলে নাগরিক সেবা আরও উন্নত করা সম্ভব হতো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে ধার্যকৃত বিভিন্ন কর, আরোপিত সম্পত্তি কর ও মালবাহী ভাড়া গাড়ির ওপর থেকে প্রাপ্ত অর্থই হলো পৌরসভার প্রধান আয়ের উৎস। এখান থেকে সবচেয়ে প্রধান আয়ের উৎস হলো হোল্ডিং ট্যাক্স-এর ওপর আরোপিত কর।
পৌরসভার কর আদায় কর্মকর্তা আব্দুল মাবুদ রাজন দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, 'শুধু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ১০ হাজার ৭০৯ টাকা। এরমধ্যে সরকারি দুই একটি প্রতিষ্ঠান কোন সময় কর দেয়নি। যার বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি। '
এই কর্মকর্তা বলেন, 'যাঁদের বেশি বকেয়া রয়েছে, তাঁদেরকে নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। পর পর তিনবার নোটিশ অমান্য করলে জিনিসপত্র ক্রোক করা হয়। এছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হোল্ডিং ট্যাক্স বকেয়া থাকলে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। আবাসিক গৃহের পৌরকর বকেয়া থাকলে জাতীয়তা সনদ, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু ও ওয়ারিস সনদ প্রদান করা হয়না।'
২০১২ সালে নোটিশ অমান্যকারীদের বাসা থেকে মালামাল ক্রোক করা হয়েছিল বলে জানান কর আদায় বিভাগের এই কর্মকর্তা।
এদিকে যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠানে পৌরকর বকেয়া রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে সদর দপ্তর - মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ প্রদানের জন্য চলতি সনে ( ২০২৬-২৭) অনুলিপি প্রেরণ করেছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
পৌরসভার প্রধান নিবাহী কর্মকর্তা ( সিইও ) মো: আদনান চৌধুরী দৈনিক কক্সবাজারকে বলেছেন, 'বেসরকারি হোল্ডিং -এর ক্ষেত্রে সম্প্রতি পৌরসভার সকল ওয়ার্ডে বকেয়া কর পরিশোধের জন্য মাইকিং করা হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর -২০২৬ এর মধ্যে পৌরকর পরিশোধ না করা হলে পৌরসভার বিধিমালা -২০১৩ এর ১০ নং বিধি মোতাবেক ব্যবস্থ নেওয়া হবে।'
পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন, 'সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া কর নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। প্রায় ৫ কোটি টাকার মত হোল্ডিং কর বকেয়া থাকায় কর্মচারীর বেতনও ঠিক মত দিতে পারছেন না পৌর কর্তৃপক্ষ। যাঁদের বেশি কর বকেয়া তাঁদের কয়েকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বকেয়াসহ ধার্য কর আদায়ের লক্ষ্যে সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাপক প্রচারণা চালানোর উদ্যেগ নিয়েছে পৌরসভা। দেওয়া হচ্ছে রিবেট (ছাড়)। দ্রুতই কর আদায়ের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে আশা করি।'