বিএনপি সরকার গঠনের পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের দেওয়া বিভিন্ন দাবি ও প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে এলাকায় গিয়ে জনগণের সব দাবি পর্যায়ক্রমে পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী গত শনিবার একদিনের সরকারি সফরে কক্সবাজার আসেন। মাছুয়াখালী খাল খনন , মাতামুহুরি ও পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, শহীদ ওয়াসিমের পরিবারের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র প্রদানসহ ৮টি কর্মসূচিতে যোগদান করেন প্রধানমন্ত্রী। এদিন রাত ৮ টায় শহরের একটি অভিজাত হোটেলে সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে কক্সবাজার-৩ (কক্সবাজার পৌরসভা, সদর, রামু ও ঈদগাঁও) সংসদীয় এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রেীকরণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিকাশে ১০ দফা সংবলিত একটি আধা-সরকারি পত্র (ডিও নম্বর: HPM 007) হস্তান্তর করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। প্রধানমন্ত্রী দাবিগুলো অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূ-অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে তা দ্রুত পূরণের আশ্বাস দেন।
সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং সময়োপযোগী দাবি হলো, একটি বিশেষায়িত সমুদ্র সম্পদ ভিত্তিক গবেষণা বা ব্লু-ইকোনমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান ও সামুদ্রিক সম্পদের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে মেরিন সায়েন্স, মৎস্য সম্পদ ও উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যেই এই প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও পাহাড়-নদী পরিবেষ্টিত এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করার অনুরোধ করা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী পৌর কাঠামোকে একটি আধুনিক সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার দাবিটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হয়েছে। একই সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে রামু উপজেলার সদর ইউনিয়ন ফতেখাঁরকুলকে পৌরসভায় রূপান্তরের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ কূটনৈতিক ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স ১৭৯৯ সনে এই রামুতে অবস্থান করেই মূলত কক্সবাজারের গোড়াপত্তন করেছিলেন এবং প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এখানে সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ বিহার ও রামকোটের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে।
এছাড়া রামু উপজেলার বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে এর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো নিয়ে "বাঁকখালী" নামে একটি নতুন উপজেলা গঠনের দাবি করা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও কৌশলগত অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কটিকে দ্রুত ৬ লেনে উন্নীত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে নবগঠিত ঈদগাঁও উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল ও জনসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ে উপজেলা কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
তৃণমূলের অর্থনীতি ও চাষিদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজার হওয়া সত্ত্বেও উৎপাদকরা যে ন্যায্যমূল্য ও বাজারজাতকরণ সংকটে ভুগছেন, তা দূরীকরণে একটি স্বতন্ত্র ‘লবণ বোর্ড’ গঠনের দাবি জানানো হয়।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে প্রবাসী, বিদেশি পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের যাতায়াত সহজ হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবশেষে উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত ভূমিহীন মানুষের আবাসন, জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণের মানবিক আবেদন জানানো হয়েছে।
সংসদ সদস্যের কাছ থেকে ডিও পত্রটি গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'কক্সবাজারের সার্বিক উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বিশেষ করে ব্লু-ইকোনমি, পর্যটন খাতের আধুনিকায়ন এবং লবণ চাষিদের অধিকার রক্ষায় সরকার দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেবে। তিনি সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলকে আশ্বস্ত করে বলেন, উত্থাপিত প্রতিটি দাবি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হবে।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ১০ দফা দাবি সংবলিত ডিও পত্র হস্তান্তরের বিষয়ে কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, 'কক্সবাজার কেবল একটি পর্যটন নগরী নয়, এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিশেষ করে সদর, রামু ও নবগঠিত ঈদগাঁও অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে এই ১০ দফা দাবি এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের অবহেলিত লবণ চাষিদের অধিকার রক্ষায় একটি স্বতন্ত্র লবণ বোর্ড গঠন এবং সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগাতে ব্লু-ইকোনমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমান পৌর কাঠামো উন্নত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হলে পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জনসেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রতিটি দাবি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুনেছেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের যে ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছেন, তাতে আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি নির্দেশ দিলেই এই প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত দৃশ্যমান হবে এবং কক্সবাজারবাসী তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে।'