বিশেষ প্রতিবেদক
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালীন একটি বিরল ও আকর্ষণীয় শব্দবন্ধ দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি বলেন, "কুতুবদিয়াকে রক্ষার জন্য মাননীয় আমার অর্থমন্ত্রী আছে, আমাদের চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান, আমার কক্সবাজারের সন্তান আমাদের সালাউদ্দিন ভাই- সমগ্র বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান পিস আমাদের সালাউদ্দিন ভাই এখানে আছেন"।
এ সময় সংসদ কক্ষে উপস্থিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্যরা একযোগে টেবিল চাপড়ানোর মাধ্যমে এই বক্তব্যকে জোরালো সমর্থন জানান।
বক্তৃতার একপর্যায়ে আলমগীর ফরিদের বক্তব্যে ব্যবহৃত পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আপত্তি উত্থাপন করলে সংসদে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে বিতর্কের অবসান ঘটাতে এবং সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য মাইক প্রদানের সময় স্বয়ং স্পিকারকেও এই 'ওয়ান পিস' শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করতে দেখা যায়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে সংসদ সদস্য আলমগীর ফরিদের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং তিনি যে মাদ্রাসা শিক্ষা তথা আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ব্যক্তি, সেই তথ্য সংসদে উপস্থাপন করেন। একই সাথে ধর্মীয় সংবেদনশীল এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক জলঘোলা না করার জন্য তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান।
সংসদে উত্থাপিত এই 'ওয়ান পিস' বা 'অনন্য' উপাধিটি মুহূর্তের মধ্যেই সংসদীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু ঠিক কী কারণে সালাহউদ্দিন আহমদকে সমসাময়িক রাজনীতির মাঠে এবং সংসদীয় পরিমণ্ডলে এমন এক অনন্য চরিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা নিয়ে রাজনৈতি সচেতন ব্যক্তব ও দলের দীর্ঘদিনের কর্মীদের মাঝে কৌতূহলের শেষ নেই।
দলের প্রবীণ মহলের মতে, এর মূল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তাঁর অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং নিশ্চিত মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে ফিরে আসার এক অলৌকিক রোমাঞ্চকর ইতিহাস ও বর্তমানে দেশের রাজনীতে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্যে।
অনেকেই মন্তব্য করেন যে, সালাহউদ্দিন আহমদের জীবনপ্রবাহ যেকোনো রূপালি পর্দার রোমাঞ্চকর কাহিনীর চেয়েও গভীর। ১৯৮৫ সালে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে ক্ষমতার চাদরে মোড়া এই নিশ্চিত ও নিরাপদ আমলাতান্ত্রিক জীবন তাকে বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করে, ইস্তফা দিয়ে তিনি সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে নেমে আসেন এবং কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন।
আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্তর ও নিশ্চিত ক্যারিয়ার ছেড়ে এমন অনিশ্চিত ও কন্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক জীবনে অবতীর্ণ হওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিই একটি বিরল নজির।
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি চকরিয়া-পেকুয়া (কক্সবাজার-১) আসনের সর্বস্তরের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীকে পরিণত হন। ফলে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালের চারদলীয় জোট সরকারে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করেন। সবশেষ ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দপ্তরের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, স্বাধীনতার দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়ে কক্সবাজার জেলা থেকে তিনিই প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, যা স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে সমগ্র জেলাবাসীর কাছে এক অনন্য ও গৌরবময় উচ্চতায় আসীন করেছে।
তবে সালাহউদ্দিন আহমদকে 'ওয়ান পিস' বলার সবচেয়ে বড় এবং অকাট্য কারণটি নিহিত রয়েছে তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার, রহস্যময় ও চাঞ্চল্যকর অধ্যায় পেরিয়ে বার্তমানে রাজনীতিতে বলিষ্ঠ আবদান রেখে যাওয়ার মাধ্যমেই বলে মনে করেন দলের নেতাকর্মীরা। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা থেকে তিনি আকস্মিকভাবে নিখোঁজ তথা গুমের শিকার হন। দীর্ঘ দুই মাস যাবত তাঁর কোনো হদিস না থাকায় যখন চারদিকে চরম হতাশা, ঠিক তখনই অলৌকিকভাবে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে উন্মুক্ত রাজপথে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে অনুপ্রবেশের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ভারতীয় আদালত থেকে তিনি সসম্মানে খালাস পেলেও দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ ১০ বছর তাঁকে প্রবাসে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দীর্ঘ নির্বাসন চুকিয়ে বীরের বেশে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং দেশের সামগ্রিক সংস্কার ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে, গুমের দীর্ঘ ১০ বছর পর ফিরে এসে পুনরায় দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার মতো এমন নাটকীয়, লড়াকু ও অবিচল জীবন সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিতেই মেলা ভার।
সংসদে শুধু প্রশংসার জোয়ারেই নয়, বরং চরম সংকটের মুহূর্তেও সালাহউদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে। গতকাল বাজেটের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যাকে কেন্দ্র করে যখন সরকারি দল ও বিরোধী দলের মাঝে তীব্র বাদানুবাদ ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ধীরস্থিরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তিনি যেমন একদিকে নিজের দলীয় সংসদ সদস্যের বক্তব্যের মূল সুরকে আগলে রেখেছেন, ঠিক তেমনি অন্যদিকে সংসদীয় পরিবেশ ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে এক ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন, যা স্পিকারসহ সংসদের উভয় পক্ষের সাধুবাদ কুড়িয়েছে।
সংসদ সদস্য ফরিদের ভাষায়- "জেলা মন্ত্রী ছিলেন, তিনি জেলা মন্ত্রী ছিলেন আগে ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে, এখনও তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী"।
সরকারি চাকুরির উচ্চপদ থেকে রাজপথের সংগ্রাম, গুমের অন্ধকার থেকে দীর্ঘ ১০ বছরের নির্বাসন এবং সবশেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসনে আসীন হয়ে দেশের রাজনীতিতে এক বলিষ্ঠ ও দিকনির্ণয়কারী নেতৃত্ব প্রদান- সব মিলিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ সত্যিই বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে এক অনন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও ব্যতিক্রমী চরিত্র। আর এই কারণেই কক্সবাজারের সংসদ সদস্যের মুখ থেকে উচ্চারিত "সারাদেশের ওয়ান পিস" তকমাটি আজ দেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন দলের সচেতন নেতাকর্মীরা।