উখিয়ার বালুখালী এলাকা এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি নূরুল আমিন এবং তার পরিবারের অপরাধ নেটওয়ার্ক স্থানীয় সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত নামলেই বালুখালী খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকা, কালভার্ট ও কবরস্থানকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয় এই চক্রটি। সীমান্ত থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক সরবরাহ, ছিনতাই, অপহরণ ও নানা অপকর্ম চালায় তারা। গভীর রাতে ফাঁদ পেতে ঘরে ফেরা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের সর্বস্ব লুটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নূরুল আমিনের বিরুদ্ধে।
আলোচিত আজিজুল হক প্রকাশ ‘জুলু ডাকাত’-এর ছোট ছেলে নূরুল আমিন। তার সংঘবদ্ধ চক্রের কারণে বালুখালী ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
স্থানীয় লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, বালুখালীর আলোচিত 'জুলু ডাকাত'-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই অপরাধ চক্রে রয়েছে তার বড় ছেলে বাবুল, মেজো ছেলে নূরুল আমিন, অপর ছেলে জানে আলম, মেয়ের জামাতা (সেনাবাহী থেকে চাকরিচ্যুত) রাসেল এবং আরেক মেয়ের জামাতা তথা রোহিঙ্গা মাদক কারবারিদের প্রধান আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত নূরুল সওদাগর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল ও নাশকতার পরিকল্পনা করতে জুলু ডাকাতের বাড়িতে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছিল—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। অভিযানে সন্ত্রাসী নূরুল আমিনকে তার কোমর থেকে গোঁজা একটি বিদেশি পিস্তলসহ তার দুই সহযোগী জানে আলম ও সোহেলকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তার বাড়ি তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয় ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি একে-২২ রাইফেল, ১টি দেশীয় পিস্তল, ২টি একনলা বন্দুক, ২টি দেশীয় ধারালো অস্ত্র, ১টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২টি রাইফেলের ম্যাগাজিন, ৪ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৮৯ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, ২টি কার্তুজ, ২টি ওয়াকিটকি সেট, ১টি ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল। এ সময় সেনা উপস্থিতি টের পেয়ে ঘর থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায় চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য রাসেল। আটককৃতদের পরবর্তীতে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগেও একাধিকবার মাদক মামলাসহ টেকনাফ থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন এই নূরুল আমিন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, জামিনে মুক্ত হয়ে এসেই তিনি পুনরায় পুরোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
সূত্রগুলো জানায়, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর রোহিঙ্গা মাদক কারবারিদের সাথে টাকার লেনদেন নিয়ে প্রকাশ্যে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে নূরুল আমিনের সাথে। ওই সময় তার গুলিতে জুবায়ের (২৫) নামের এক নিরীহ রোহিঙ্গা যুবক তলপেটের নিম্নাংশে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। বর্তমানে তিনি পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ঘটনায় জুবায়ের সিআইসি-এর অনুমতি নিয়ে মামলা করতে চাইলে, আসামিরা তাকে তুলে এনে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে এবং জোরপূর্বক প্রায় দুই লাখ টাকা আদায় করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, জুলু ডাকাতের প্রভাব খাটিয়ে তার মেয়ের জামাতা নূরুল সওদাগর সরকারি খাস জমি দখল করে বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই বাড়ির আঙিনায় বাঁশ, কাঠ ও ত্রিপল দিয়ে প্রায় ৩৫টি অবৈধ সেল্টার (ঝুপড়ি ঘর) তৈরি করে সেখানে রোহিঙ্গা মাদক কারবারিদের আশ্রয় দিয়ে আসছেন। শরণার্থী শিবিরের বাইরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই চক্রটি তাদের সেখানে অবাধে বসবাসের সুযোগ করে দিচ্ছে।
সেনাক্যাম্পের খুব কাছে (২০০ মিটারের মধ্যে) রোহিঙ্গাদের এই অবৈধ উপস্থিতি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ বাহিনী বিশেষ অভিযান চালিয়ে সহস্রাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে নিবন্ধিত শিবিরে ফেরত পাঠায়।
আইন অমান্য করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে নূরুল সওদাগরকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি নূরুল সওদাগর পুনরায় তার বাড়িতে রোহিঙ্গা মাদক কারবারিদের আশ্রয় দিতে শুরু করে। বনবিভাগের পাহাড় ও জমি দখল করে অবৈধ স্থাপনা তৈরির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে গোয়েন্দা সদস্যদের ওপরও আক্রমণাত্মক আচরণ করে সে। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সে ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলে, 'আমি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, তাতে প্রশাসনের সমস্যা কী?'—যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
বালুখালী সেনা ক্যাম্পের মাত্র ২০০-৩০০ মিটারের মধ্যে এখনো শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবার এই চক্রের আশ্রয়ে বসবাস করছে, যারা সরাসরি অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। ক্যাম্পের এত কাছে অপরাধী রোহিঙ্গাদের এই উপস্থিতি দেশের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কুখ্যাত 'জুলু ডাকাত' এবং তার পুরো অপরাধ সিন্ডিকেটের (নূরুল আমিন, নূরুল সওদাগর ও তাদের সহযোগীদের) বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। পাশাপাশি ক্যাম্পের আশপাশের অবৈধ রোহিঙ্গা আস্তানাগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করে এলাকায় স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।