হুবহু নকল কণ্ঠ, হোয়াটসঅ্যাপে ওসি-এসপির ছবি ও লোগো-এভাবেই কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলকে টার্গেট করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। পুলিশ বক্স নির্মাণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের নামে কয়েকটি হোটেল থেকে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। প্রতারণার বিষয়টি জানাজানির পর বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে চক্রটি শনাক্তে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
শুরুটা ৫ আগস্ট। হোয়াটসঅ্যাপে সদর থানার ওসি পরিচয়ে ফোন আসে এক্সোটিকা সাম্পানের জেনারেল ম্যানেজারের কাছে। বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হচ্ছে পুলিশ বক্স, সেখানে হোটেলের ব্র্যান্ডিং করতে দিতে হবে টাকা। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে এরপর এসপি পরিচয়ে ফোন। প্রথমে বিকাশে দুই লাখ টাকা, পরে ল্যাপটপ-আইফোন-সামসাং ফোন ছাড়ানোর নামে ট্যাক্স-ভ্যাটের অজুহাত। দফায় দফায় শেষ পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
এক্সোটিকা সাম্পানের জেনারেল ম্যানেজার মো. জুবায়ের বলেন, ৫ আগস্ট সদর থানার ওসি পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে পুলিশ বক্স নির্মাণ ও সেখানে হোটেলের ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বলা হয়। পরে এসপি পরিচয়েও ফোন করা হয় এবং তাঁর ছবি ও পুলিশের লোগো ব্যবহার করে যোগাযোগ করা হয়। বিষয়টি বিশ্বাস করে আমরা দুটি বুথের জন্য টাকা দিতে সম্মত হই।
প্রথমে বিকাশে চার দফায় দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে ল্যাপটপ, আইফোন ও স্যামসাং ফোন ছাড়ানোর নামে ট্যাক্স-ভ্যাটের কথা বলে আরও টাকা চাওয়া হয়। সবমিলিয়ে আমার এমডির ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মোট পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
টাকা নেওয়ার পর প্রতারকরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। পরে পুলিশ সুপারের অফিসিয়াল পেজে সতর্কবার্তা দেখে আমরা প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হই এবং থানায় জিডি করি। আমরা চাই, দ্রুত প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং আমাদের টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক।
একই কৌশলে ফাঁদে পড়ে হোটেল কক্স-টুডে। ওসি ও এসপি পরিচয়ে ফোন। পুলিশ বক্সে ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বলে দুই দফায় নেওয়া হয় দুই লাখ টাকা।
হোটেল কক্স-টুডে’র হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা পলাশ দত্ত বলেন, কিছুদিন আগে সদর থানার ওসি পরিচয়ে ফোন করে পুলিশ বক্স স্থাপন ও সেখানে হোটেলের ব্র্যান্ডিংয়ের কথা বলা হয়। এর ১০ মিনিট পর এসপি পরিচয়েও আরেকজন ফোন করেন। তাদের কথাবার্তায় বিশ্বাস করে দুই দফায় ব্যাংক হিসাবে মোট দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়।
পরে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে এসপি মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো টাকা চাওয়া হয়নি। তখনই বুঝতে পারি, আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। পরে সদর থানায় জিডি করি। আমরা চাই, পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে যারা প্রতারণা করছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
টাকা দেওয়ার পরই সন্দেহ। পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়-এমন কোনো পুলিশ বক্স নির্মাণ বা অর্থ আদায়ের নির্দেশই দেওয়া হয়নি। এরপর বেরিয়ে আসে আরও ভুক্তভোগীর তথ্য। সীগাল, গ্রিন নেচারসহ বেশ কয়েকটি হোটেলও একইভাবে প্রতারিত হয়েছে।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি শেখ মুহাম্মদ আলী বলেন, ৫ সেপ্টেম্বর হোটেল সিগাল কর্তৃপক্ষ পুলিশ বক্স নির্মাণের কথা বলে প্রতারকদের প্রায় আট লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগে এজাহার দেয়। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তদন্ত ও অভিযান শুরু করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে এক্সোটিকা সাম্পানসহ কয়েকটি হোটেল থেকেও টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক ও বিকাশ লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কক্সবাজারের পাশাপাশি ঢাকা ও শ্রীমঙ্গল থেকেও টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। টাকা তোলার সময়ের সিসিটিভি ফুটেজে কয়েকজনকে শনাক্ত করা যাচ্ছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
পুলিশের পরিচয়ে কেউ টাকা চাইলে দেওয়ার আগে অবশ্যই থানার সরকারি নম্বর, ডিউটি অফিসার বা পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সত্যতা যাচাই করতে হবে।
এদিকে পুলিশের দাবি, ২০ দিনে চক্রটি হাতিয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। কক্সবাজারের পাশাপাশি ঢাকা ও শ্রীমঙ্গল থেকেও তোলা হয়েছে এসব টাকা। সিসিটিভিতে মিলেছে সন্দেহভাজনদের ছবি। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার একজন; শনাক্ত করা হচ্ছে চক্রের অন্য সদস্যদেরও।
ওসি শেখ মুহাম্মদ আলী বলেন, বুধবার রাতে কক্সবাজার পৌরসভার সৈকতপাড়া থেকে জিয়াবুল হক গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার জিয়াবুল হক (৩২) চট্টগ্রাম জেলার লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের তেলিয়াপাড়ার আকতার কামালের ছেলে। তিনি বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সৈকতপাড়ায় বসবাস করেন। সেখানে তার আবরার এন্টারপ্রাইজ নামে মোবাইল ব্যাংকিং ও মোবাইল এক্সেসরিজ এর দোকান রয়েছে। গ্রেপ্তার যুবকের হেফাজত থেকে ব্যাংকের ভিন্ন হিসাব নম্বরের ৩টি চেক বই ও ১০টি মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করা হয়েছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, পর্যটন নগরীর হোটেল-মোটেলকে টার্গেট করে পুলিশের নাম ও কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছি। কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্তের পর্যায়ে রয়েছি।
কেউ ওসি, এসপি বা অন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ে টাকা চাইলে যাচাই ছাড়া অর্থ দেবেন না। পুলিশ কোনো কাজের জন্য এভাবে টাকা বা ডোনেশন দাবি করে না। সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানা বা পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
অনলাইনে বা সরাসরি পুলিশের পরিচয়ে টাকা দাবি করলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি। আর প্রতারককে ধরতে গিয়ে ঝুঁকি না নিয়ে নিরাপদে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খবর দিন।