অগুনতি মানুষের চোখের জল আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন কক্সবাজার পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দুইবারের সাবেক জনপ্রিয় কাউন্সিলর ও বিশিষ্ট সমাজসেবক সাহাব উদ্দিন সিকদার। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ঐতিহ্যবাহী কক্সবাজার হাসেমিয়া কামিল মাদ্রাসা মাঠে তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নামে। মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মানুষের উপস্থিতি আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিত এই জানাজার আগে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে মরহুমের স্মৃতিচারণ করেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সাবেক কাউন্সিলর, জনপ্রতিনিধি ও স্বজনরা।
জানাজার আগে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, "একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাহাব উদ্দিন সিকদার মানুষের কাছে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন, আজকের এই বিশাল জানাজাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সে মানুষের জন্য অনেক কাজ করেছে এবং মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছে।"
বিএনপি নেতা ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোস্তাক আহমেদ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "আকার-প্রকার কোনো বিষয় নয়, কর্মই মানুষকে মহৎ করে তোলে। আজকের এই জানাজাই সাহাব উদ্দিন সিকদারের কর্মের জ্বলন্ত প্রমাণ। এলাকাবাসীর তার মতো একজন মানবিক মানুষের খুব বেশি প্রয়োজন ছিল।"
পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আশরাফুল হুদা জামশেদ বলেন, "সে অত্যন্ত মানবদরদী একজন জনপ্রতিনিধি ছিল। এলাকার উন্নয়নের জন্য সে পৌর পরিষদের সভায় প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করত। সে সবসময় হাসি-মুখে মানুষের সাথে কথা বলত।"
জানাজাপূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মরহুমের ছোট ভাই এমতাজ হোসেন কান্নায় ভেঙে পড়েন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমার ভাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তি হারিয়ে আজ আমরা সবাই দিশেহারা। আপনারা সবাই আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।" তিনি জানান, তাঁর ভাইয়ের যদি কোনো আর্থিক লেনদেন বা দেনা থেকে থাকে, তবে শোক কাটিয়ে ওঠার পর তাদের পরিবার তা পরিশোধ করবে।
জানাজা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন— ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হেলাল উদ্দিন কবির, ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সালাউদ্দিন সেতু, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওমর সিদ্দিক লালু, ২ নম্বর ওয়ার্ডের আক্তার কামাল, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর টিপু, আলিয়া জাহান ইসলামিয়া বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সুপার রফিক বিন সিদ্দিক এবং সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম। তাঁরা প্রত্যেকেই সাহাব উদ্দিন সিকদারের কর্মময় জীবনের প্রশংসা করেন এবং তাঁর যেকোনো ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার জন্য উপস্থিত জনতার কাছে অনুরোধ জানান।
দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর সাহাব উদ্দিন সিকদারের মৃত্যু নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন গুজব ও বিভ্রান্তিরও জবাব দেন স্বজনরা। জানাজাপূর্ব বক্তব্যে পরিবারের এক সদস্য জানান, প্রথম একটি হাসপাতাল থেকে ডেথ কল (মৃত্যুর খবর) আসার পরও ভাইদের সন্দেহ হলে তারা লাইফ সাপোর্ট খুলে স্পন্দন পরীক্ষা করেন। স্পন্দন পেয়ে দ্রুত তাঁকে পার্কভিউ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে অক্সিজেনের মাত্রা ৪০-এ নেমে এলে ডাক্তাররা পরিবারের কাছে আশা ছেড়ে দেওয়ার কথা জানান। অবশেষে বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ২৫ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন।
মরহুমের ছোট ভাই বলেন, "যেখানে যা প্রয়োজন ছিল, আমার ভাইকে সর্বোচ্চ ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) দেওয়ার জন্য আমরা কোনো কসুর করিনি। কিন্তু আল্লাহ তাকে আমাদের কাছে রাখেননি।"
জানাজার নামাজ শেষে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে আলিরজাহাল এলাকার এজাহার মিয়া চৌধুরী পারিবারিক কবরস্থানে এই জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধিকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) রাতে নিজ ভবনের তিন তলার ব্যালকনি থেকে দুর্ঘটনাবশত নিচে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হন সাহাব উদ্দিন সিকদার (৪১)। টানা কয়েকদিন চট্টগ্রাম এভার কেয়ার ও পার্কভিউ হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে থাকার পর বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাত ৮টা ২৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর জানাজানি সবত্র শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে শোক ও শোকাতুর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে পোস্ট করেন।